বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

সৌদিগামী ৮৬ ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত, অনিশ্চয়তায় ১৩ হাজার ৪৯০ যাত্রী

রিয়াদে হামলার জেরে বিমান চলাচলে বিপর্যয়; চাকরি, ভিসা ও কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কায় প্রবাসীরা, জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজন

সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে ঢাকা থেকে সৌদিগামী বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে ৮৬টি ফ্লাইট বাতিল অথবা স্থগিত হয়েছে। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অন্তত ১৩ হাজার ৪৯০ জন যাত্রী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসী কর্মী, নতুন চাকরিতে যোগ দিতে যাওয়া ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং পবিত্র ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া মানুষ।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ৩৬টি সরাসরি এবং ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর দেশটির বিমান চলাচলে নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায়।

কোন এয়ারলাইনসের কত ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি সৌদিগামী ৩৬টি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৪টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, রিয়াদ এয়ারওয়েজের সাতটি এবং সৌদিয়া এয়ারলাইনসের পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য ও পার্শ্ববর্তী দেশের বিমানবন্দর হয়ে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এসব ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের ২২টি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি, সালামএয়ারের চারটি এবং ইজিপ্টএয়ারের একটি ফ্লাইট রয়েছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।

পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে এসব সিদ্ধান্ত ও সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে প্রবাসী কর্মীরা

ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন সৌদি আরবে কর্মরত এবং নতুন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রার অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশিরা।

অনেক প্রবাসী নির্ধারিত ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আবার অনেকে নতুন ভিসা ও নিয়োগপত্র নিয়ে প্রথমবারের মতো সৌদি আরবে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে জটিলতা, কাজে যোগদানে বিলম্ব এবং আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে নতুন চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে নিয়োগপত্রে নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। একইভাবে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তবে ফ্লাইট বাতিলের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো কর্মীর চাকরি বা ভিসা বাতিল হয়ে যাবে—এমনটি নয়। বিষয়টি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ভিসার শর্ত, নিয়োগকর্তার সিদ্ধান্ত এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রযোজ্য বিধিবিধানের ওপর।

ওমরাযাত্রী ও সাধারণ যাত্রীদেরও দুর্ভোগ

শুধু প্রবাসী কর্মী নন, সৌদি আরবগামী ওমরাযাত্রী এবং অন্যান্য যাত্রীরাও বিপাকে পড়েছেন।

অনেকেই আগে থেকে বিমান টিকিট, হোটেল ও যাতায়াতের ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছিলেন। আকস্মিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিতের ফলে তাঁদের ভ্রমণসূচি পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওমরা পালনের পরিকল্পনা করা যাত্রীদের ক্ষেত্রে হোটেল বুকিং, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে।

এ অবস্থায় যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনস ও ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সর্বশেষ ফ্লাইট পরিস্থিতি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

চাকরি ও ভিসা সুরক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি

সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও ভিসাসংক্রান্ত স্বার্থ সুরক্ষা।

ফ্লাইট বাতিলের কারণে কোনো কর্মী নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে তাঁর অনুপস্থিতির কারণ সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো প্রয়োজন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনে যোগদানের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং ভিসার মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।

পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট তথ্যসেবা ও অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলে তাঁদের অনিশ্চয়তা কমানো সম্ভব হবে।

বিকল্প বিমানবন্দর ও রুট ব্যবহারের সম্ভাবনা

চলমান সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিকল্প বিমানবন্দর ও রুট ব্যবহারের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সৌদি আরবের যেসব বিমানবন্দরে স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, সেসব বিমানবন্দর ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিমান সংস্থাগুলো যাচাই করতে পারে।

তবে বিকল্প রুটে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি, বিমানবন্দরের সক্ষমতা, যাত্রীদের ভিসার শর্ত এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করা অপরিহার্য।

একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের পুনঃটিকিটায়ন, ভ্রমণের তারিখ পরিবর্তন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অর্থ ফেরতের বিষয়েও বিমান সংস্থাগুলোর স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

রেমিট্যান্স ও অর্থনীতিতেও প্রভাবের আশঙ্কা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার হওয়ায় দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ফ্লাইট বিপর্যয় দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রা বিলম্বিত হতে পারে। একইভাবে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা কর্মীদের আয় ও চাকরির ধারাবাহিকতায় সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে বর্তমান ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে কতটা আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন

বর্তমান পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে যেসব কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি কিংবা যাঁদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাকরিতে যোগদান বাধ্যতামূলক, তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করে অগ্রাধিকারভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বেবিচক, সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলেও অনিবার্য কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

অনিশ্চয়তা কাটার অপেক্ষায় হাজারো পরিবার

সৌদি আরবের বিমান চলাচল পরিস্থিতি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে ফ্লাইট পরিচালনার পরবর্তী সময়সূচি।

এর মধ্যে হাজারো বাংলাদেশি যাত্রী ও তাঁদের পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বিশেষ করে যাঁদের বিদেশযাত্রার সঙ্গে পরিবারের জীবিকা, ঋণ পরিশোধ কিংবা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয়টি জড়িত, তাঁদের জন্য প্রতিটি দিনের বিলম্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগই পারে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে এবং প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থানের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন