২৫ কেজি নয়, ১০০ কেজি চাল দিলেও সচেতনতা ছাড়া ইলিশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়; জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান গড়ার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার
ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি সহায়তার চেয়েও জেলেদের মানসিক অঙ্গীকার, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, জেলেরা নিজেরা মা ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সচেতন না হলে তাঁদের ২৫ কেজি কেন, ১০০ কেজি চাল দিলেও ইলিশ সংরক্ষণের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৬ উপলক্ষে আজ চাঁদপুর সদর উপজেলার পশ্চিম দাসাদি গ্রামের বড় খান বাড়ির মাঠে নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণ ও সচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষার আহ্বান
মন্ত্রী বলেন, মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। বিপরীতে, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা হলে পরবর্তী বছরে ইলিশের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়াতে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জেলেদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁরা সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ইলিশের জীবনচক্র, প্রজনন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে আগামী বছরও ইলিশ পাওয়া যাবে। তাই মা ইলিশ সংরক্ষণের দায়িত্ব জেলেদেরই সবচেয়ে বেশি।
চাঁদপুরের ইলিশের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার তাগিদ
চাঁদপুরের ইলিশের অতীত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। ইলিশ পরিবহন ও সংরক্ষণের জন্য এখানে অনেক বরফকল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় সেই কর্মচাঞ্চল্যও অনেকটা হারিয়ে গেছে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি নদী ও সংশ্লিষ্ট জলজ পরিবেশের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।
জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান গড়ার পরিকল্পনা
মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময়ে জেলেদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ সময় অনেক জেলেকে পরিবার চালাতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ নিতে বাধ্য হন, যা জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শুধু সাময়িক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে জেলেদের জন্য টেকসই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সরকার চিন্তা করছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, চাঁদপুরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা বিবেচনায় নিয়ে নদীর পানিকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ অঞ্চলে প্রচলিত পদ্ধতিতে পুকুরে মাছ চাষ সব সময় সহজ নয়। বর্ষায় পানি বেড়ে গেলে মাছ ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে নদীতে খাঁচায় মাছ চাষসহ আধুনিক ও উপযোগী প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
সরকার-জেলে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ও জেলেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি জেলেদের নিজেদের ভবিষ্যৎ ও পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। ইলিশের প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখা গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়বে। এর সুফল জেলে পরিবারসহ দেশের মৎস্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই ভোগ করবেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন চাঁদপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এ কে এম সেলিম উল্যা সেলিম। এ সময় স্থানীয় মৎস্যজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণ করেন মন্ত্রী।

