বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বাড়ছে, অভিযোগ শেখ হাসিনার

দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় নিরাপত্তাহীনতা, মন্দিরে হামলা ও বিচারহীনতার অভিযোগ; সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় দেশবাসীর প্রতি আহ্বান

বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা, নির্যাতন এবং নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, দেশের হিন্দু সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য তুলে ধরা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

দুর্গোৎসব উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা, মন্দির ও বসতবাড়িতে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি, নারীদের ওপর সহিংসতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এসব ঘটনার যথাযথ বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের ওপর হামলার অভিযোগও তুললেন

শেখ হাসিনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কথিত হামলার ঘটনাগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়েছে। পাশাপাশি দলটির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি এবং অন্যান্য সম্পত্তিও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই বিচারের বাইরে থেকে গেছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের পরিবেশ অব্যাহত রয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।

কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের প্রসঙ্গ

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেন।

তিনি রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং ভালুকার দীপু চন্দ্র দাস হত্যার ঘটনা তুলে ধরে এসব মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এ ছাড়া সনাতন ধর্মীয় নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার ও তাঁর মায়ের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য সীমিত সময়ের প্যারোল দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

তাঁর দাবি, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে মিথ্যা মামলায় আটক রাখা হয়েছে। তিনি এসব ঘটনাকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে উল্লিখিত মামলাগুলোর বিচারিক অবস্থা এবং শেখ হাসিনার অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আহ্বান

দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছাবার্তায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সব নাগরিকের সমান অধিকারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ধর্ম যার যার হলেও উৎসব সবার। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা কিংবা অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক আদর্শে বিশ্বাসী নাগরিকদের হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ

শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগের ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের কথাও উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, ওই ইশতেহারে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করা।

দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা সরকারের

এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার চলতি বছরের দুর্গাপূজায় সরকারি অনুদান বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।

পাশাপাশি উৎসব উপলক্ষে সরকারি ছুটি বৃদ্ধি এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বিশেষ নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হয়নি

এনডিটিভির প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বক্তব্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলেও তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা অভিযুক্ত পক্ষগুলোর সরাসরি প্রতিক্রিয়াও ওই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

ফলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বৃদ্ধির দাবি, বিচারহীনতার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বক্তব্যগুলো শেখ হাসিনার নিজস্ব অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।

তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, উপাসনালয়ের সুরক্ষা এবং সহিংসতার ঘটনায় কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি বাংলাদেশের মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছাবার্তার শেষাংশে শেখ হাসিনা সব ধর্মের মানুষের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

তথ্যসূত্র: NDTV, ভারত


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন