কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রতারণা প্রতিরোধ, মহাকাশে কম্পিউটিং, মানব অঙ্গের বিকল্প তৈরি ও রোবটনির্ভর উৎপাদন প্রযুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত লড়াইয়ে পাঁচ উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি সম্মেলন ‘টেকক্রাঞ্চ ডিসরাপ্ট ২০২৬’-এর স্টার্টআপ ব্যাটলফিল্ড প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছে পাঁচটি উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মহাকাশ প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা এসব প্রতিষ্ঠান এখন মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা ও এক লাখ মার্কিন ডলারের পুরস্কার জয়ের অপেক্ষায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ১৩ থেকে ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত তিন দিনের প্রযুক্তি সম্মেলনে প্রাথমিকভাবে ২০টি স্টার্টআপ তাদের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি প্রদর্শন করে। দুই দিন ধরে বিশেষজ্ঞ বিচারকদের সামনে সরাসরি প্রযুক্তি প্রদর্শন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপন এবং কঠিন প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এআই দিয়ে প্রতারকদের ফাঁদে ফেলবে Apate.ai
অনলাইন ও টেলিফোন প্রতারণা প্রতিরোধে অভিনব প্রযুক্তি তৈরি করেছে Apate.ai। প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত ভার্চুয়াল এজেন্ট ব্যবহার করে, যারা সাধারণ মানুষের পরিচয়ে প্রতারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
এসব এআই এজেন্ট সন্দেহজনক ফোনকল গ্রহণ, প্রতারণামূলক বার্তার জবাব দেওয়া, ফিশিং লিংকে প্রবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারক চক্রের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে।
বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ, ভাষা ও উচ্চারণের মানুষের মতো কথা বলার সক্ষমতা রয়েছে এসব এজেন্টের। এর মাধ্যমে প্রতারকদের দীর্ঘ সময় কথোপকথনে ব্যস্ত রেখে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বন্যপ্রাণী নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রযুক্তি Flox Intelligence
মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে এসেছে Flox Intelligence।
প্রচলিত বৈদ্যুতিক বেড়া, সাইরেন, আলো কিংবা প্রাণী নিধনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেন্সরভিত্তিক একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
কোনো প্রাণী নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করলে মোশন সেন্সর সক্রিয় হয়। এরপর ক্যামেরা ও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণীর প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।
শনাক্তকৃত প্রাণীর আচরণ অনুযায়ী বিশেষ শব্দ তৈরি করে তাকে ওই এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যন্ত্রটি।
প্রযুক্তিটি কৃষিজমি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এলাকায় ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গবেষণাগারে মানব অন্ত্র তৈরি করছে Intero Biosystems
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে Intero Biosystems।
প্রতিষ্ঠানটি গবেষণাগারে মানুষের অন্ত্রের অনুরূপ ক্ষুদ্র টিস্যু বা ‘ইনটেস্টাইনাল অর্গানয়েড’ তৈরি করছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন ওষুধ কিংবা রাসায়নিক উপাদান মানবদেহে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা মানুষের ওপর পরীক্ষার আগেই গবেষণাগারে মূল্যায়ন করা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের তৈরি অর্গানয়েডে মানুষের অন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের কোষ ও টিস্যুর উপস্থিতি রয়েছে। ফলে প্রচলিত সরল পরীক্ষামূলক মডেলের তুলনায় এটি মানবদেহের বাস্তব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরও কার্যকর ধারণা দিতে পারে।
কারখানায় উৎপাদনব্যবস্থা বদলে দেবে Industrial Next
শিল্পকারখানার উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত রোবটিক ওয়ার্কস্টেশন তৈরি করেছে Industrial Next।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব এআই মডেল ক্যামেরার মাধ্যমে বস্তু শনাক্তকরণ, কাজের পরিস্থিতি বোঝা এবং রোবটের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে একত্র করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি উৎপাদন লাইন নতুন কাজের উপযোগী করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগলেও তাদের প্রযুক্তিতে তা কয়েক মিনিটে সম্ভব।
বিশেষভাবে প্রোগ্রামিং ছাড়াই জটিল ও সূক্ষ্ম উৎপাদনকাজ পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে প্রযুক্তিটি তৈরি করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্মার্টফোনের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কিছু রোবটিক ওয়ার্কস্টেশন ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছে টেকক্রাঞ্চ।
মহাকাশেই তৈরি হবে কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক, উদ্যোগ Satlyt-এর
মহাকাশ প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে Satlyt।
প্রতিষ্ঠানটি এমন সফটওয়্যার তৈরি করছে, যার মাধ্যমে একাধিক স্যাটেলাইট নিজেদের মধ্যে বড় ধরনের কম্পিউটিং কাজ ভাগাভাগি করে সম্পন্ন করতে পারবে।
বর্তমানে মহাকাশযানের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু যোগাযোগে বিলম্ব এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে এ ব্যবস্থা সব সময় কার্যকর নয়।
Satlyt-এর প্রযুক্তিতে স্যাটেলাইট নিজেরাই এআই ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ফলে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে দুটি পরীক্ষামূলক মহাকাশ মিশনে প্রতিষ্ঠানটির সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী লক্ষ্য হলো দুটি স্যাটেলাইটের মধ্যে সমন্বিত কম্পিউটিং ক্লাউড তৈরির সক্ষমতা প্রদর্শন করা।
বিজয়ীর জন্য এক লাখ ডলার, দিতে হবে না মালিকানার অংশ
টেকক্রাঞ্চ ডিসরাপ্ট ২০২৬-এর স্টার্টআপ ব্যাটলফিল্ডের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
চূড়ান্ত পর্বে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতারা বিশেষজ্ঞ বিচারকদের সামনে আবারও নিজেদের প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তুলে ধরবেন।
বিচারকদের মূল্যায়নে নির্বাচিত বিজয়ী প্রতিষ্ঠান পাবে মর্যাদাপূর্ণ ‘স্টার্টআপ ব্যাটলফিল্ড কাপ’ এবং এক লাখ মার্কিন ডলার।
বিশেষ বিষয় হলো, এই অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের ব্যবসার কোনো মালিকানা বা শেয়ার ছাড়তে হবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে নতুন প্রতিযোগিতা
এবারের প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত পাঁচ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখন আর শুধু তথ্য অনুসন্ধান কিংবা স্বয়ংক্রিয় কথোপকথনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
অনলাইন প্রতারণা শনাক্তকরণ, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা গবেষণা, শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং মহাকাশযানের স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো জটিল ক্ষেত্রেও এআইভিত্তিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের সামনে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তুলে ধরার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি খাতের মনোযোগ আকর্ষণের সুযোগ পাচ্ছে।
এবারের স্টার্টআপ ব্যাটলফিল্ডে কোন প্রতিষ্ঠান বিজয়ী হবে, তা নির্ধারণের পাশাপাশি আগামী দিনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ও উদ্ভাবনের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যাবে।
তথ্যসূত্র: TechCrunch

