বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় মেটার বড় চমক, উন্মোচন করল ‘Muse Wonder’ ও ‘Wonder Full’

OpenAI ও Anthropic-এর শক্তিশালী এআই মডেলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে মেটার নতুন উদ্যোগ; দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তি, জটিল সমস্যা সমাধান ও কোডিংয়ে বিশেষ গুরুত্ব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে নতুন দুটি উন্নত এআই মডেল উন্মোচন করেছে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। ‘Muse Wonder’ ও ‘Muse Wonder Full’ নামের মডেল দুটিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফ্রন্টিয়ার এআই মডেল তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) মেটার সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাব থেকে মডেল দুটি প্রকাশ করা হয় বলে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে।

নতুন মডেলগুলোর মাধ্যমে OpenAI ও Anthropic-এর মতো প্রতিষ্ঠানের অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামার লক্ষ্য নিয়েছে মেটা।

আগের মডেলের তুলনায় কী পরিবর্তন?

এর আগে মেটা ‘Muse Spark’ নামে অপেক্ষাকৃত ছোট ও দ্রুতগতির একটি এআই মডেল প্রকাশ করেছিল। সেটি মূলত কম সময়ে ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং তুলনামূলক কম কম্পিউটিং শক্তিতে কাজ করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়।

অন্যদিকে Muse Wonder ও Wonder Full আকারে বড় এবং আরও জটিল কাজ সম্পাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিশেষ করে সফটওয়্যার কোডিং, বিশ্লেষণধর্মী কাজ, জটিল নির্দেশনা অনুসরণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহারকারীর সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে নতুন মডেলগুলো উন্নত ফলাফল দেখিয়েছে বলে মেটার পরীক্ষায় উঠে এসেছে।

GPT-6 Astra ও Fable 5.1-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা

মেটার প্রকাশিত মডেল কার্ড অনুযায়ী, বিভিন্ন সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় Muse Wonder ও Wonder Full প্রতিদ্বন্দ্বী Fable 5.1 এবং GPT-6 Astra-এর কাছাকাছি ফলাফল অর্জন করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ অর্জন তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

মেটার ব্লগে নতুন মডেলগুলোকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে এসব ফলাফল মেটার নিজস্ব পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রকাশিত। স্বাধীন গবেষকদের মাধ্যমে সব সক্ষমতার তুলনামূলক যাচাই এখনো নিশ্চিত নয়।

ব্যবহারকারীর তথ্য মনে রাখার সক্ষমতায় বিশেষ গুরুত্ব

নতুন মডেলগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘অ্যাকটিভ মেমোরি’ বা সক্রিয় স্মৃতিশক্তি।

মেটার লক্ষ্য এমন এআই সহকারী তৈরি করা, যা ব্যবহারকারীর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে মনে রাখতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগাতে পারবে।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা অনুযায়ী, Muse Wonder স্মৃতিশক্তি মূল্যায়নের বিশেষ পরীক্ষা MemoryBench-এ Fable, Opus ও Astra-এর তুলনায় বেশি স্কোর অর্জন করেছে।

মেটার গবেষক কাভ্য কোপ্পারাপু মডেল প্রকাশ উপলক্ষে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় জানান, ব্যবহারকারীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিন, সপ্তাহ কিংবা মাসের পর মাস মনে রাখার সক্ষমতা উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক গবেষণা করেছে।

এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত এআই সহকারীকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তির সঙ্গে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন মডেল ব্যবহারে কত খরচ?

মেটার ঘোষণা অনুযায়ী, Muse Wonder মডেলটি Meta Model API-এর মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে।

প্রতি ১০ লাখ ইনপুট টোকেন ব্যবহারে খরচ হবে ৪ মার্কিন ডলার এবং প্রতি ১০ লাখ আউটপুট টোকেনের জন্য দিতে হবে ২০ ডলার।

এই মূল্যকাঠামো উন্নত এআই মডেলের বাজারে GPT-6 Sol ও Opus 5.5-এর কাছাকাছি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে আরও শক্তিশালী Muse Wonder Full সাধারণ API ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে না। এটি শুধু Muse Code-এর গ্রাহকেরা ব্যবহার করতে পারবেন।

এ ছাড়া মেটার নিজস্ব ‘Muse Agent’ পরিচালনাতেও নতুন মডেল দুটি ব্যবহার করা হবে।

এআই গবেষণায় আলেকজান্ডার ওয়াংয়ের নেতৃত্বের প্রভাব

মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যক্রম পুনর্গঠনের পর এটিই প্রতিষ্ঠানটির প্রথম বড় পরিসরের ফ্রন্টিয়ার মডেল প্রকাশ।

২০২৫ সালের আগস্টে Scale AI-এর প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার ওয়াং মেটার এআই গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

এরপর প্রতিষ্ঠানটি Muse Spark এবং Muse Agent প্রকাশ করলেও OpenAI ও Anthropic-এর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করার মতো বড় মডেল প্রকাশ থেকে বিরত ছিল।

নতুন মডেল দুটি প্রকাশের মাধ্যমে মেটা সেই অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ডেটা সেন্টারে প্রশিক্ষণ

মেটা জানিয়েছে, নতুন এআই মডেলগুলো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির ‘Prometheus’ ডেটা সেন্টারে।

চলতি বছরের শুরুতে চালু হওয়া এই অবকাঠামো মেটার বৃহৎ পরিসরের এআই গবেষণা ও মডেল প্রশিক্ষণের অন্যতম কেন্দ্র।

উন্নত এআই মডেল তৈরিতে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি, বিশেষায়িত চিপ এবং বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ফলে এ ধরনের বৃহৎ ডেটা সেন্টার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় নতুন সমীকরণ

মেটার নতুন মডেল প্রকাশের মধ্য দিয়ে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে জটিল কাজ সম্পাদন এবং সফটওয়্যার তৈরির সক্ষমতা আগামী দিনের এআই প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

তবে মেটার নতুন মডেলগুলো বাস্তব ব্যবহারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কতটা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে, তা নির্ভর করবে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা, স্বাধীন মূল্যায়ন, নির্ভরযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন