সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আর্থিক সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক • রাজনৈতিক অনুদান ও সরকারি উদ্যোগে বিপুল অর্থ সহায়তার তথ্য সামনে
প্রান্তকাল আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মাননা পেয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন প্রভাবশালী উদ্যোক্তা ও নির্বাহী। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ‘গোল্ডেন এজ অব আমেরিকান ইনোভেশন সামিট’ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন।
সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন এবং এএমডির প্রধান নির্বাহী লিসা সু।
তাঁদের দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স’।
একই অনুষ্ঠানে ডেল টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেল এবং মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা পেয়েছেন ‘ন্যাশনাল মেডেল অব টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন’।
তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতির এই আয়োজনের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তাঁদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আর্থিক সম্পর্ক।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ রিপাবলিকের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তাঁদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থসহায়তা বা অর্থসহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই বিপুল অঙ্কের অর্থের মধ্যে রাজনৈতিক অনুদানের পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে আর্থিক প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। ফলে পুরো অর্থকে সরাসরি ট্রাম্পের নির্বাচনী তহবিলে দেওয়া অনুদান হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ নয়।
ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে বিপুল অর্থসহায়তা
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ও মাইক্রোসফট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিষেক তহবিল এবং হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে অর্থসহায়তা দিয়েছে।
অন্যদিকে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএমডি ট্রাম্পপন্থী একটি সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটিকে (সুপার প্যাক) অনুদান দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতির একটি এসেছে মাইকেল ডেল ও তাঁর স্ত্রী সুসান ডেলের পক্ষ থেকে। তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের শিশুদের জন্য সঞ্চয় কর্মসূচি ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’-এ সহায়তার উদ্দেশ্যে ৬২৫ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এটি শিশুদের ভবিষ্যৎ আর্থিক সঞ্চয়ের জন্য নেওয়া একটি কর্মসূচি। ফলে এই অর্থকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যয় করা অনুদানের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।
তবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন প্রশাসনের এমন আর্থিক সম্পৃক্ততা সরকারি স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের প্রশংসায় ট্রাম্প
অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকেরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক অসাধারণ ভবিষ্যৎ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁদের উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের কারণেই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো খাতে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তিরা?
সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন।
ইলন মাস্ক বৈদ্যুতিক গাড়ি, মহাকাশ প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।
এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট ও কম্পিউটিং অবকাঠামোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।
গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন ইন্টারনেট সার্চ প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এএমডির প্রধান নির্বাহী লিসা সু উন্নত প্রসেসর ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে মাইকেল ডেল কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো খাতে এবং সত্য নাদেলা ক্লাউড কম্পিউটিং, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
মাইক্রোসফটকে ঘিরেও বিতর্ক
অনুষ্ঠানের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলাকে সম্মাননা প্রদান।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসন মাইক্রোসফটকে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার পরপরই নাদেলাকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
এইচ-১বি কর্মসূচির মাধ্যমে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি দক্ষ পেশাজীবী, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতের কর্মীদের নিয়োগ দিতে পারে।
তবে মাইক্রোসফটের ওপর কথিত স্থগিতাদেশের আইনগত ভিত্তি, কার্যকারিতা ও বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও রাজনৈতিক অনুদানের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স এবং ন্যাশনাল মেডেল অব টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন বিজ্ঞান, প্রকৌশল, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয়।
সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রযুক্তিগত অবদান উল্লেখযোগ্য হলেও তাঁদের সঙ্গে প্রশাসনের আর্থিক সম্পর্ক নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ফলে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক অনুদান দিয়েছে বলেই সেই অনুদানের বিনিময়ে সম্মাননা পেয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন। প্রকাশিত তথ্য থেকে এ ধরনের কোনো বিনিময়মূলক সমঝোতা নিশ্চিত করা যায়নি।
বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ফেডারেল সরকারের সম্পর্ক ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। সরকারি চুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, অভিবাসন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অর্থায়ন—সব ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে।
ফলে প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আর্থিক সম্পর্কের তথ্যও জনস্বার্থে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদানের স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা—দুটি বিষয়ই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত ও প্রশাসনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে।

