বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

এক যুগের অপেক্ষা শেষে দানদং-সিনুইজু সড়ক সেতু চালু

নতুন সেতুতে দুই দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা; নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনে অগ্রগতি নিয়ে সতর্ক বিশ্লেষকদের

দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষা ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চালু হয়েছে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সড়কপথে যুক্ত করা নতুন সেতু। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ নামের সেতুটি চালু করা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।

প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুকে যুক্ত করেছে। ভবিষ্যতে এটি দুই দেশের স্থলবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুরোনো সেতুর বিকল্প নতুন অবকাঠামো

নতুন সেতুটি মূলত জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে নির্মিত পুরোনো ‘চীন-উত্তর কোরিয়া মৈত্রী সেতু’র বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। পুরোনো সেতুটির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানোই নতুন অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।

২০১৪ সালেই নতুন সেতুটি চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কে অবনতি ঘটলে প্রকল্পটির কাজ থমকে যায়। উত্তর কোরিয়ার অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্ক অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেতুটি চালুর সময় অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়।

বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং সেতুটিকে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ‘সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, নতুন এই পথ দুই দেশের বাণিজ্য এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

বাণিজ্য বাড়লেও বড় উল্লম্ফন নিয়ে সংশয়

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। দেশটির অর্থনীতির জন্যও বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা মহামারির আগের পর্যায়ে বাণিজ্য ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই বাণিজ্যের বড় অংশই উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি।

জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় নতুন সেতু চালুর পরপরই সীমান্তবাণিজ্যে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার হানকুক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং বিবিসিকে বলেন, চীনা পণ্যের অবাধ প্রবেশ উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে পিয়ংইয়ং সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার এই উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে চীনও সম্ভবত ধীরে ধীরে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথে এগোবে।

ঐতিহাসিক বন্ধুত্বে টানাপড়েন

চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বোঝাতে প্রায়ই ‘দাঁত ও ঠোঁটের মতো নিবিড় সম্পর্ক’ কথাটি ব্যবহার করা হয়।

তবে এই বন্ধুত্ব সব সময় মসৃণ ছিল না। ২০১০-এর দশকে উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা দেখা দেয়। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বেইজিংয়ের কঠোর অবস্থান ও সমালোচনায় পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে।

পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান তুলনামূলক নমনীয় হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে আবারও উষ্ণতা ফিরতে শুরু করে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বিবিসিকে বলেন, এক দশক আগেও উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার দাবিতে বেইজিং প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিত। বর্তমানে এ বিষয়ে চীন অনেকটাই নীরব।

যোগাযোগ পুনরায় চালু, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতাও আলোচনায়

মহামারির কারণে দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সরাসরি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল এবং বেইজিং-পিয়ংইয়ং ফ্লাইট পুনরায় চালু করা হয়। নতুন সেতু চালুর মধ্য দিয়ে দুই দেশের যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে চীন। গত মাসেই রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রথম সড়ক সেতু চালু হয়েছে। ওই সেতু দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি যানবাহন ও দুই হাজার মানুষ পারাপার করতে পারছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্রিয় বেইজিং। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পিয়ংইয়ং সফর করে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করেন।

সিউলের এহওয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলির মতে, ইয়ালু নদীর সেতু চালু হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতির প্রমাণ। তাঁর ভাষ্য, শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফর যে কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, নতুন সেতুর উদ্বোধন তা স্পষ্ট করেছে।

তবে সেতুটি চালু করতে এক যুগের বেশি সময় লেগে যাওয়ার বিষয়টি চীনের জন্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার জটিলতাও তুলে ধরে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন