বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

হরমুজে হামলার বিস্তার, ঝুঁকিতে কন্টেইনার ও পণ্যবাহী জাহাজ, ডুবল দুই জাহাজ

ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকের আঘাতে কন্টেইনারবাহী ও বাল্ক ক্যারিয়ার বিধ্বস্ত; একজন ক্রু নিহত, ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার

হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি পৃথক দুটি ঘটনায় গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একটি কন্টেইনারবাহী জাহাজ ও একটি ড্রাই বাল্ক ক্যারিয়ার ডুবে গেছে। বুধবার সামুদ্রিক কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। জাহাজ দুটিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরকের আঘাতের পর এ ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত একজন ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন, অন্যদিকে একটি জাহাজের ২১ জন ক্রুকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর অবরোধ এবং গত মাসে আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে হামলা জোরদার করেছে বলে জানিয়েছে ইরান। এর ফলে গত ১০ দিনে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে।

আগুন ধরে ডুবল সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজ

সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ছোট কন্টেইনারবাহী জাহাজ ‘জিএফএস প্রাইড’ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হয়। এতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আগুন ধরে যায় এবং পরে সেটি ডুবে যায়।

সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি (এমপিএ) বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, জাহাজটির ২১ জন ক্রু সদস্যকেই নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এ ধরনের হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, এ ধরনের হামলা বিনা প্ররোচনায় সংঘটিত, সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।

ডুবে গেল ‘কেপ দাও’, নিহত এক ক্রু

জাতিসংঘের শিপিং সংস্থা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, পৃথক আরেকটি ঘটনায় অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী ‘কেপ দাও’ নামের জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছে ডুবে গেছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর একটি প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সামুদ্রিক সূত্র জানিয়েছে, হামলার পরপরই ক্রুদের সরিয়ে নেওয়া হলেও একজন ক্রু সদস্য নিহত হন।

জাহাজটির সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ‘পিওনিজ শিপ ম্যানেজমেন্ট এফজেডই’-এর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

যুদ্ধ শুরুর পর ডুবল একাধিক জাহাজ

আইএমওর দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে ‘জিএফএস প্রাইড’ ও ‘কেপ দাও’ যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয়।

এর আগে গত মার্চে মাল্টার পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ ‘সাফিন প্রেস্টিজ’ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হরমুজ প্রণালির উত্তরে ডুবে যায়।

সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘মারিস্কস’ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর বর্তমান হুমকি শুধু তেলবাহী ট্যাংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কন্টেইনারবাহী জাহাজ ও বাল্ক ক্যারিয়ারও গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বাড়ছে উদ্বেগ

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে এবং জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, তেলের দাম চড়া রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ইরান প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করছে।

হরমুজ প্রণালির কাছে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন