নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান, দাবি বিএনপির এই নেতার | দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি ও ক্ষেত্র বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রস্তুত করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে শহীদ জেহাদ স্মৃতি পরিষদ আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদের ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়।
রিজভী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন বা এক দিনের ঘটনা ছিল না। এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কাজ করেছে।
নব্বইয়ের আন্দোলন থেকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কথা স্মরণ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিতে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা নাজির উদ্দিন জেহাদ। আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, জেহাদের আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেতনা আরও শক্তিশালী হয়, যা পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামেও প্রভাব রেখেছে।
তিনি বলেন, নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেতনা এবং পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ধারাবাহিকতাতেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল।
খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থান ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ
রিজভী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা, শারীরিক নির্যাতন ও কারাবরণের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে বিএনপি মনে করে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে অনড় ছিলেন।
অন্যদিকে, প্রবাসে অবস্থান করেও তারেক রহমানের নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে ওঠে বলে দাবি করেন রিজভী। তাঁর মতে, খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থান এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হওয়া এবং জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের সম্মিলিত প্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে।
বিগত সরকারের বিরুদ্ধে লুটপাট ও গুম-খুনের অভিযোগ
বিগত সরকারের কঠোর সমালোচনা করে রিজভী বলেন, নব্বইয়ের পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তি এবং চব্বিশে পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি একই সূত্রে গাঁথা। তাঁর অভিযোগ, বিগত ১৭ বছরে দেশে ব্যাপক লুটপাট, ব্যাংক খালি করা, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং গুম-খুনের রাজনীতি চালানো হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে এখনও ফ্যাসিবাদের দোসররা সক্রিয় রয়েছে। এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রিজভী বলেন, যারা ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা করেছে এবং জনগণের অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো উচিত নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিলে জনগণ সরকারের পাশে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রশাসনে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান রিজভী।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। জনগণের অর্থ লুটপাট, গুম ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রিজভীর বক্তব্যে বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত বলে অভিযোগ করা অপরাধগুলোর বিচার এবং প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সতর্ক থাকার আহ্বান
আসন্ন দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, বাংলাদেশ হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছেন এবং একে অপরের ধর্মীয় উৎসবে অংশ নেন।
তবে পরাজিত অপশক্তি দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনপির নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
রিজভী বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে সতর্ক থাকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
স্মরণসভায় বিএনপি ও ছাত্র আন্দোলনের নেতারা উপস্থিত
শহীদ জেহাদ স্মৃতি পরিষদের সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে স্মরণসভায় যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) খায়রুল কবির খোকন এবং সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নাজিম উদ্দিন আলম।
সভায় আরও বক্তব্য দেন ১৯৯০-এর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, বেগম রোকেয়া হলের সাবেক ভিপি ও সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা, ঢাকা কলেজের সাবেক ভিপি ও বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সফু এবং ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
এ ছাড়া ১৯৯০ সালের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
স্মরণসভায় বক্তারা শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদের আত্মত্যাগ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করেন। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।

