রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

ব্যাংক খাতের আর্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর সরকারকে প্রতিবছর বাজেট থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, এই অর্থ দিয়ে দুই কোটি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব ছিল কিংবা নির্মাণ করা যেত দুটি পদ্মা সেতু।

ব্যাংক খাতের আর্থিক সংকট ও অনিয়মের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি অর্থায়নের প্রয়োজন হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ব্যাংক খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর সরকারকে প্রতিবছর বাজেট থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা করে দিতে হবে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ওয়ান ব্যাংকের আয়োজনে বাংলা কিউআর লেনদেনের প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি দেখতে পেয়েছেন, ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ চুরি হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “আমি যখন গভর্নরের দায়িত্ব নিয়েছি, তখন এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হয়ে গেছে। ব্যাংক খাতের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর সরকারকে প্রতিবছর বাজেট থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা করে দিতে হবে।”

ব্যাংক খাতের ক্ষতি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ বোঝাতে গিয়ে গভর্নর বলেন, এই বিপুল অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা সম্ভব ছিল। তাঁর মতে, প্রতিবছর যে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রয়োজন হতে পারে, সেই অর্থ দিয়ে দুই কোটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেত। একই অর্থ দিয়ে দুটি পদ্মা সেতুও নির্মাণ করা সম্ভব ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গভর্নরের এই বক্তব্যে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের আর্থিক প্রভাব এবং এর দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তা উঠে এসেছে। জনগণের অর্থ লুটপাটের অভিযোগ, নেওয়া হচ্ছে আইনি ব্যবস্থা

ব্যাংক খাতের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। তিনি বলেন, জনগণের অর্থ লুট করে নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ঘটনাগুলোকে কেবল চুরি হিসেবে বর্ণনা করা যথেষ্ট নয়; বরং এর সঙ্গে লুটপাট জড়িত।

গভর্নর বলেন, “লুটেরারা জনগণের টাকা নিয়ে গেছে। এটাকে শুধু চুরি বললে হবে না, তারা লুট করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে কারা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, কত টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কতটুকু—এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

ব্যাংক খাতের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার যে কথা গভর্নর বলেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে সরকারি বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হতে পারে। পাঁচ থেকে আট বছরের হিসাবে এ অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ কোটি থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।

এই বিপুল অর্থের প্রয়োজনীয়তা ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়।

তবে এই অর্থায়নের পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সরকারি বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দের শর্ত কী হবে এবং ব্যাংক খাতের ক্ষতি পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা জানা গেলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বক্তব্যে দেশের ব্যাংক খাতে আর্থিক অনিয়মের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় এবং এর সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে জনগণের অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পেয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন