রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

শেষ বিদায়ের মাঠে কফিনবন্দি খালিদী

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শোকের আবহে শেষ বিদায় জানানো হলো বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে। শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে তাঁর শেষ বিদায়ের আয়োজনে উপস্থিত হন বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। স্মৃতিচারণে উঠে আসে দেশের অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে তাঁর অবদান, সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান এবং সাংবাদিকতার প্রতি নিষ্ঠার কথা।

দুপুর আড়াইটার দিকে খালিদীর শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এক পশলা বৃষ্টি থেমে মাঠে রোদ উঠলেও স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে ছিল শোকের আবহ।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান খালিদীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, তাঁর প্রয়াণের খবর এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সূত্র ধরে তাঁদের পরিচয়, পরে যা বন্ধুত্বে রূপ নেয়। খালিদী শুধু সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্মৃতিচারণে বলেন, একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে সেটি পরিচালনা করা খালিদীর বড় অর্জন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ তাঁকে সাংবাদিক ও মানুষ হিসেবে অতুলনীয় বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতায় খালিদী ছিলেন একজন পথিকৃৎ।

কলাম লেখক চিররঞ্জন সরকার বলেন, সাংবাদিকতা, মানবিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের কারণে খালিদী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অভিনেতা তারিক আনাম খান তাঁর নিষ্ঠা ও স্পষ্টবাদিতার কথা স্মরণ করেন। অভিনেত্রী নিমা রহমান তুলে ধরেন তাঁর আন্তরিকতা, আতিথেয়তা ও কাজের প্রতি আগ্রহের স্মৃতি।

বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক খ ম হারূন বলেন, ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার আগেই খালিদী অনলাইন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার সাহসী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বটতলার নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দারও তাঁর দূরদর্শিতা এবং তরুণদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহের কথা স্মরণ করেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক স্পোর্টস সম্পাদক ও দৈনিক আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পক্ষে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের জন্যও খালিদী ছিলেন একটি মডেল। সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, সাংবাদিকতায় সংযম ও দূরদর্শিতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।

সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সংবাদে নির্ভুলতা, তথ্যের সূত্র উল্লেখ এবং পাঠকের আস্থা অর্জনের ওপর তাঁর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও। তাঁদের মতে, সাংবাদিকতার এসব মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।

যেভাবে দেশে ফিরল তাঁর মরদেহ

ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা অবস্থায় গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। তাঁকে সেখানকার সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

গত ৮ অক্টোবর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেইন মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শনিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তাঁর মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কফিন গ্রহণ করেন তাঁর ভাতিজা তারাফ তাজিজ খালিদী ও ভাগনি-জামাই আকিফ আহমেদ।

বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নেওয়া হয় মহাখালীতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কার্যালয়ে। সেখানে দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মরদেহ রাখা হয়। পরে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের শেষবারের মতো দেখার জন্য নেওয়া হয় তাঁর বাসায়।

বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে জানাজা শেষে বিকেল ৫টার দিকে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ভূমিকা, সংবাদ পরিবেশনে তাঁর পেশাদারত্ব এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানের কথা স্মরণ করে সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা জানান শেষ শ্রদ্ধা। তাঁর প্রয়াণে দেশের সাংবাদিকতা জগতে তৈরি হলো এক শূন্যতা, আর রেখে গেলেন দীর্ঘ কর্মজীবনের অসংখ্য স্মৃতি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন