রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগে গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ইতিবাচকভাবে বিবেচনায়

২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান | সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে অংশগ্রহণের বিষয়টিও জাতীয় স্বার্থ ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার দিক বিবেচনায় ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনা করছে সরকার। এসব কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

শনিবার (১০ অক্টোবর) ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কবিষয়ক এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।

জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে অগ্রাধিকার

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, জাপান সফরে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গভীর করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো।

জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে। আসন্ন সফরে বিদ্যমান সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সরকারের প্রত্যাশা, উচ্চপর্যায়ের এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় জাপানি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা

প্রস্তাবিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং এ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে চুক্তিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর কল্যাণে সম্ভাব্য অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি জানান, চুক্তিতে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করলে সরকার অনুকূল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিশেষ করে মক্কা ও মদিনাকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিও বিবেচনার বিষয় বলে ইঙ্গিত দেন প্রতিমন্ত্রী।

সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে হুমায়ুন কবির জানান, সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সুবিধাজনক সময়ে তিনি রিয়াদ সফর করবেন। একই সঙ্গে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সও বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক ঐতিহ্যগতভাবে শ্রম অভিবাসন ও রেমিট্যান্সনির্ভর হলেও এখন এ সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, শ্রম অভিবাসন ও রেমিট্যান্স দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও সেটিই সম্পর্কের সর্বোচ্চ সীমা হতে পারে না। বরং বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়া প্রয়োজন।

ভিশন ২০৩০ ঘিরে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন খাতে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, লজিস্টিকস, কৃষি, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধশিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সুযোগ রয়েছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে উপযুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, দুই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও বিনিয়োগের সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সুযোগ তৈরি হবে।

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্ব

সৌদি আরবের পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ থেকে আরও দক্ষ ও পেশাদার জনশক্তি পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে তা সৌদি আরবের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং কর্মীদের প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

একই সঙ্গে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা সরকারের অগ্রাধিকার থাকবে বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কেবল জনশক্তি রপ্তানি বা আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত নয়; বরং দক্ষতা, পারস্পরিক সুবিধা এবং সহযোগিতার গুণগত মান বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা

সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) ড. মো. নজরুল ইসলাম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিজওয়ানুর রহমান এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

এনএসইউর সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক সূচনা বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান এবং একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সমন্বয়ক ড. সেলিম রেজা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ উজ জামান প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন