মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকরা। প্রায় ১০ বছরের গবেষণায় পরীক্ষাগারে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের সাফল্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাইয়ে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে দেশে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করতে নতুন একটি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন কুয়েটের বিজ্ঞানীরা। মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ প্রক্রিয়াজাত করে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনের এ উদ্যোগ সফল হলে দেশের জ্বালানি খাত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রকল্পটির প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ তথ্য জানান।
প্রদর্শনীতে গবেষকরা তাঁদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, গবেষণার অগ্রগতি এবং বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটির কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হন এবং এর সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
১০ বছরের গবেষণায় বায়োক্রুড উৎপাদনে অগ্রগতি
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর ধরে এ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। এতে ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ (এইচটিএল) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন কুয়েটের গবেষকরা।
এ প্রযুক্তিতে উপযুক্ত তাপমাত্রা ও চাপে পানির উপস্থিতিতে জৈব বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে তরল জ্বালানির কাঁচামাল তৈরি করা হয়। সাধারণভাবে যেসব জৈব বর্জ্য পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, সেগুলোকে এ ধরনের প্রক্রিয়ায় মূল্যবান জ্বালানিসমৃদ্ধ উপাদানে রূপান্তর করার সুযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের গবেষক কুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীকে গবেষণার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি এবং এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতির বিষয় তুলে ধরেন।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্য এসেছে।
তবে পরীক্ষাগারে পাওয়া উৎপাদনহার থেকে সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনের ব্যয়, জ্বালানির চূড়ান্ত গুণমান কিংবা বাজারে ব্যবহারের উপযোগিতা নির্ধারণ করা যায় না। বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন, পরিশোধন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির বাস্তব সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে পাইলট প্ল্যান্টের পরিকল্পনা
গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয়, বায়োক্রুডের গুণমান এবং বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
পাইলট প্ল্যান্ট মূলত গবেষণাগারের পরীক্ষার ফল বাস্তব উৎপাদন পরিবেশে যাচাই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখানে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যের প্রাপ্যতা, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার ব্যয়, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা এবং উৎপাদিত তেলের মান পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদিত বায়োক্রুডের পরবর্তী পরিশোধন ব্যয়ও মূল্যায়ন করতে হবে। এসব বিষয় সন্তোষজনক হলে প্রযুক্তিটি বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের পথ তৈরি হতে পারে।
আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা
গবেষকদের প্রত্যাশা, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, এ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে এ হিসাব সম্ভাব্য উৎপাদন ও প্রতিস্থাপনের ভিত্তিতে করা প্রাথমিক অনুমান। প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক উৎপাদনক্ষমতা, উৎপাদিত জ্বালানির গুণমান, পরিশোধন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এবং আমদানিকৃত তেলের কতটা কার্যকরভাবে বিকল্প জ্বালানি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়—এসব বিষয়ের ওপর।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎস থেকে বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের কার্যকর প্রযুক্তি গড়ে উঠলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনা
বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এ উদ্যোগের সম্ভাব্য সুফল শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
শহরাঞ্চলে জৈব বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে কৃষিজ অবশিষ্টাংশের বড় একটি অংশও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয় না। এসব উপাদান থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রযুক্তি কার্যকর হলে বর্জ্যের অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হতে পারে।
তবে পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে পুরো উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মূল্যায়ন প্রয়োজন। বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত শক্তি, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার নির্গমন এবং অবশিষ্ট পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রযুক্তিটি পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হলেই এর বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা আরও শক্তিশালী হবে।
বাণিজ্যিক বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ
প্রকল্পটির গবেষকরা মনে করছেন, সরকারি সহায়তায় প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, উৎপাদিত তেলের মান যাচাই এবং পরবর্তী বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের জন্য অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটি পরিদর্শনের সময় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সরকারের এ সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে গবেষণাগারের অর্জনকে শিল্প পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে গবেষণার ফলাফল, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানির গুণমান, বর্জ্যের ধারাবাহিক সরবরাহ এবং বাজারে বায়োক্রুড ব্যবহারের বাস্তব সুযোগের ওপর। এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে।
জ্বালানি খাতে দেশীয় উদ্ভাবনের সুযোগ
প্রকল্পটি সফল হলে দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি উৎপাদন এবং গবেষণাভিত্তিক শিল্প বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনকে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রদর্শনীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এ উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি গবেষণা প্রকল্প। তবে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিস্থাপন এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পরীক্ষাগারের সাফল্যকে বাস্তব উৎপাদনে প্রমাণ করতে হবে। পাইলট প্ল্যান্টের কার্যকারিতা, ব্যয় ও জ্বালানির মান যাচাইয়ের পরই প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

