রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

রেলের লাভজনক পণ্য পরিবহণ খাত অবহেলায় ধুঁকছে, সম্ভাবনা ৪ হাজার কোটি টাকার

প্রতিদিন ২৫টি মালবাহী ট্রেন পরিচালনার সুযোগ থাকলেও সপ্তাহে চলছে মাত্র ৩ থেকে ৪টি। ইঞ্জিন ও ওয়াগন সংকট, সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারা এবং অব্যবস্থাপনায় কমছে রেলপথে পণ্য পরিবহণ। অথচ সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের মোট পণ্যের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রেলে পরিবহণ করা গেলে বছরে এ খাত থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় সম্ভব।

বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়ের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত পণ্য পরিবহণ। তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়, একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য বহনের সক্ষমতা এবং দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহণের সুবিধা থাকায় এ খাতে রেলের বড় আয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন, ওয়াগন ও জনবলের সংকট, দুর্বল পরিচালনব্যবস্থা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতার কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২৫টি মালবাহী ট্রেন পরিচালনার সুযোগ থাকলেও বর্তমানে সপ্তাহে চলাচল করছে মাত্র ৩ থেকে ৪টি। দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহণের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ রেলপথে সম্পন্ন হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পণ্য পরিবহণে সড়কপথের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও রেলওয়ে হারাচ্ছে বড় অঙ্কের সম্ভাব্য আয়।

রেলওয়ের আয় বাড়ানো এবং লোকসান কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে পণ্য পরিবহণ খাতকে শক্তিশালী করার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও ওয়াগন সংগ্রহ, নিয়মিত মালবাহী ট্রেন পরিচালনা, সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ভরযোগ্য সেবা চালু করা গেলে এ খাত থেকেই রেলওয়ের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।

পণ্যবাহী ট্রেনে আয় বেশি, তবু পরিচালনায় অনীহা কেন?

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি যাত্রীবাহী ট্রেন একবার গন্তব্যে পৌঁছে সর্বোচ্চ দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় করতে পারে। বিপরীতে একটি মালবাহী বা কনটেইনার ট্রেনের একবারের যাত্রায় আয় হতে পারে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা।

একই সূত্রের দাবি, যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ কম। এই হিসাব অনুযায়ী, পণ্য পরিবহণে রেলওয়ের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানোরও সুযোগ রয়েছে।

তবে বাস্তবে এ খাতের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। ইঞ্জিন ও ওয়াগনের স্বল্পতা, পুরোনো রোলিংস্টক এবং পরিচালনাগত জটিলতায় নিয়মিত মালবাহী ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্যও পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ফলে একদিকে পণ্য পরিবহণের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রেল সেই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না, অন্যদিকে সম্ভাব্য আয়ও অধরা থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্য পরিবহণকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ট্রেন পরিচালনা করা গেলে রেলওয়ের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সড়কপথের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।

১৮ বছরে আয় বেড়েছে মাত্র ৩৪ কোটি টাকা

পণ্য পরিবহণে রেলের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা বোঝা যায় আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যানেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ খাত থেকে রেলের আয় ছিল ১২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা। প্রায় ১৮ বছর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রক্ষেপণে এ খাতের আয় ধরা হয়েছে ১৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ে পণ্য পরিবহণ থেকে বার্ষিক আয় বেড়েছে মাত্র ৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা গোল করে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা।

এই সময়ে রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগের তুলনায় পণ্য পরিবহণ খাতের আয় বৃদ্ধির গতি অত্যন্ত সীমিত রয়ে গেছে।

সূত্রের হিসাবে, গত অর্থবছরে পণ্য পরিবহণ থেকে আয় এসেছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। অথচ এ খাতে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।

তবে সম্ভাব্য আয়ের এই হিসাব বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। পণ্য পরিবহণের জন্য নির্ধারিত ট্রেনের সংখ্যা, ইঞ্জিন ও ওয়াগনের প্রাপ্যতা, মাল ওঠানো-নামানোর সুবিধা, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো এবং ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের পণ্য পরিবহণে রেলের অংশ মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ

দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহণে রেলের অংশ অত্যন্ত সীমিত। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, মোট পণ্যের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ রেলপথে পরিবাহিত হয়। বাকি বড় অংশ সড়কসহ অন্যান্য পরিবহণমাধ্যমে বহন করা হয়।

অথচ দীর্ঘ দূরত্বে ভারী পণ্য, কনটেইনার, জ্বালানি এবং শিল্পের কাঁচামাল পরিবহণে রেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশকে রেলমুখী করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রেলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়লে সড়কপথে ভারী যানবাহনের চাপ কমানো, পরিবহণব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা এবং বড় চালানে পণ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রেলওয়ের রাজস্ব বৃদ্ধির পথও প্রশস্ত হবে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় সক্ষমতা না থাকায় সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। নিয়মিত মালবাহী ট্রেনের অভাব এবং পণ্য পৌঁছাতে বিলম্বের কারণে ব্যবসায়ীরা রেলকে নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

কনটেইনার পরিবহণে বড় ধস, সংকটে কমলাপুর আইসিডি

রেলপথে পণ্য পরিবহণ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) কার্যক্রমেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বর্তমানে রেলে কনটেইনার পরিবহণ প্রায় ৮৫ শতাংশ কমেছে।

সূত্রের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে ২৬ হাজার ৪১০ টনের বিপরীতে পণ্য পরিবহণ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮২ টন। এই পতন কনটেইনার পরিবহণে রেলের সক্ষমতা ও কার্যক্রমের সংকটকে সামনে এনেছে।

কনটেইনার পরিবহণ কমে গেলে শুধু রেলওয়ের রাজস্বই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; সংশ্লিষ্ট ডিপো, পণ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে। নিয়মিত ট্রেন চলাচল না থাকলে কনটেইনার পরিবহণের পরিকল্পনা ব্যাহত হয় এবং বিকল্প পরিবহণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।

কমলাপুর আইসিডির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা, সময়সূচি মেনে কনটেইনার পরিবহণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বুকিং দিয়েও জ্বালানিবাহী ট্রেন পাচ্ছে না বিপিসির কোম্পানিগুলো

পণ্য পরিবহণে সংকটের আরেকটি উদাহরণ জ্বালানি পরিবহণ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো প্রতিষ্ঠান বুকিং দেওয়ার পরও জ্বালানিবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি পরিবহণে রেল ব্যবহার করা গেলে একসঙ্গে বড় পরিমাণ পণ্য নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন, ওয়াগন ও নিয়মিত ট্রেন পরিচালনার ঘাটতি থাকলে সেই সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।

এ ধরনের পরিস্থিতি রেলওয়ের আয় বৃদ্ধির সুযোগ কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনাকেও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে জ্বালানিবাহী ট্রেন পরিচালনায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং বুকিং অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

পুরোনো ইঞ্জিন ও ওয়াগনে ব্যাহত হচ্ছে কার্যক্রম

রেলওয়ের পণ্য পরিবহণ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা রোলিংস্টকের সংকট। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মালবাহী ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহৃত ইঞ্জিনগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে নিয়মিত ট্রেন চালানোর চেষ্টা করায় যেকোনো সময় পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইঞ্জিন ও কোচের ঘাটতির কারণে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য বরাদ্দ ইঞ্জিন যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহার করতে হচ্ছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। এতে পণ্য পরিবহণের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আরও কমে যাচ্ছে।

আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন, কোচ ও ওয়াগন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন। যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন এবং সরঞ্জামের অপ্রতুলতা ট্রেন পরিচালনার নিয়মিততা ব্যাহত করতে পারে। ফলে পণ্য পরিবহণে নির্ভরযোগ্য সময়সূচি বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পণ্য পরিবহণ খাতকে সচল রাখতে নতুন ইঞ্জিন ও ওয়াগন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান রোলিংস্টকের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোন রুটে কতটি মালবাহী ট্রেন চালানো সম্ভব, তার ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত পরিচালন পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।

সময়মতো পণ্য পৌঁছায় না, অভিযোগ অব্যবস্থাপনারও

রেলপথে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছায় না। এতে ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা ব্যাহত হয় এবং রেলের ওপর আস্থা কমে যায়।

এ ছাড়া রেলের একটি অসাধু চক্র বাস, ট্রাক ও লরির মালিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহণে বাধা সৃষ্টি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ছাড়া এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

তবু সময়ানুবর্তিতার অভাব, ট্রেনের অনিয়মিত চলাচল এবং পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা যে রেলপথে পণ্য পরিবহণের আকর্ষণ কমাতে পারে, তা স্পষ্ট। ব্যবসায়ীরা সাধারণত এমন পরিবহণব্যবস্থা চান, যেখানে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানো এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।

এ কারণে রেলের পণ্য পরিবহণ বাড়াতে শুধু ট্রেন ও ওয়াগনের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং বুকিং থেকে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও সময়নির্ভর করা প্রয়োজন।

ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ বাড়লে বাড়বে ট্রেন পরিচালনার সুযোগ

দেশের রেলপথে ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ সম্প্রসারণের ফলে ভবিষ্যতে ট্রেন পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কমে গেলে নির্দিষ্ট রুটে আরও বেশি মালবাহী ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।

তবে রেলপথ সম্প্রসারণের সুফল পেতে হলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইঞ্জিন, ওয়াগন, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর অবকাঠামোও বাড়াতে হবে। শুধু রেললাইন বাড়ালেই মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি ট্রেন থেকে গড়ে ১২ লাখ টাকা আয় ধরে প্রতিদিন ১০০টি ট্রেন পরিচালনা করা গেলে বছরে আয় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। তবে এই হিসাব সম্ভাব্য আয়ের একটি অনুমান; বাস্তবে তা অর্জন করতে হলে নিয়মিত ট্রেন পরিচালনা, পর্যাপ্ত পণ্যপ্রাপ্তি, পূর্ণ সক্ষমতার ব্যবহার এবং পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে।

বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয়ের সম্ভাবনা দেখছে রেলওয়ে

রেলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়াতে পারলে বিপুল রাজস্ব অর্জন সম্ভব বলে মনে করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম জানান, দেশের মোট পণ্যের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রেলপথে পরিবহণ করা সম্ভব হলে বছরে শুধু পণ্য পরিবহণ থেকেই ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করা যেতে পারে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পণ্য পরিবহণে রেলের অংশ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই সক্ষমতা তৈরি করতে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন, ওয়াগন এবং অন্যান্য রোলিংস্টক নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে রেলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়াতে বহুমুখী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন, ওয়াগন ও রোলিংস্টক নিশ্চিত করা গেলে এ খাতের আয় বাড়ানো সম্ভব। ব্যবসায়ী মহলকে রেলমুখী করতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পণ্য পরিবহণ থেকে হাজার কোটি টাকার বেশি আয় সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

লোকসান কমাতে পণ্য পরিবহণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি

বাংলাদেশ রেলওয়ের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে পণ্য পরিবহণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান ইঞ্জিন ও ওয়াগনের কার্যকর ব্যবহার, নিয়মিত মালবাহী ট্রেন পরিচালনা, ট্রেনের সময়সূচি উন্নত করা এবং বুকিং অনুযায়ী পণ্য পরিবহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে। মধ্যমেয়াদে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, রোলিংস্টকের রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়ন এবং কনটেইনার ও জ্বালানিবাহী ট্রেনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে নতুন ইঞ্জিন ও ওয়াগন সংগ্রহ, পণ্য টার্মিনালের উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ীদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রুটভিত্তিক পরিবহণ পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।

একই সঙ্গে পণ্য পরিবহণের আয়, ব্যয়, ট্রেনের ব্যবহার, সময়ানুবর্তিতা ও গ্রাহকসেবার মান নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এতে কোন খাতে বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।

সব মিলিয়ে, রেলওয়ের পণ্য পরিবহণ খাতের বর্তমান অবস্থা একদিকে বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাও তুলে ধরছে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগের সুফল পেতে হলে এবার পণ্য পরিবহণের সক্ষমতা ও পরিচালনব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে রেলপথে পণ্য পরিবহণের সম্ভাবনা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগও কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন