পরিচালন অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ৮৮টির নিজস্ব আয় নেই। অতি উচ্চ ঋণঝুঁকিতে রয়েছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান, যাদের দায় ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। লোকসান, ঋণের দায় ও পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে।
দেশের আয়হীন ও লোকসানী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ কিংবা সীমিত থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসরকালীন সুবিধা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সরকারি অর্থে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখা এবং লোকসান সামাল দিতে প্রতিবছরই বাজেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টির নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। বাকি ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা। অথচ দেশে বর্তমানে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৩০টি।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ভর্তুকি বাবদ ৮৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি, ঋণের বোঝা এবং লোকসান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে যেসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারে না, সেগুলোর জন্য সরকারের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের পর বছর লোকসান দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর সংস্কার বা পুনর্গঠনের আওতায় না এনে একই কাঠামোয় পরিচালনা করায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
৮৮ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় নেই, ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে
অর্থ বিভাগের একাধিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন খাতে সরকারি অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টি কোনো নিজস্ব আয় করতে পারেনি। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ব্যয় নির্বাহে নিজস্ব রাজস্বের পরিবর্তে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
অন্য ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ছিল ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা। এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের আয় সীমিত থাকায় তাদের পরিচালন ব্যয় ও আর্থিক দায় মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৩০টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান কৌশলগত কারণে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, আয় ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে বর্তমানে ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৮৭ জন কর্মচারী কর্মরত। প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম দুর্বল বা বন্ধ থাকলেও কর্মীদের বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য দায় অব্যাহত রয়েছে।
ফলে যেসব প্রতিষ্ঠানের আয় নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রেও সরকারকে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। আর লোকসানী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভর্তুকি, অনুদান কিংবা ঋণ সহায়তা দিতে হচ্ছে। এতে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের সক্ষমতার ওপরও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অতি উচ্চ ঋণঝুঁকিতে ১৯ প্রতিষ্ঠান, দায় দুই লাখ কোটি টাকার বেশি
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুরবস্থার আরেকটি বড় দিক হলো ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯টি অতি উচ্চ ঋণঝুঁকিতে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের দায় ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অতি উচ্চ ঋণঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে—
- বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড
- বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)
- ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড
- ইস্টার্ন টিউবস লিমিটেড
- গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড
- মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড
- জয়পুরহাট সুগার মিলস লিমিটেড
- খুলনা ওয়াসা
- কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড
- মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড
- নাটোর সুগার মিলস লিমিটেড
- পাবনা সুগার মিলস লিমিটেড
- রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেড
- রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড
- শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড
- ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস লিমিটেড
- জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেড
- টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড
ঋণের চাপের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের আয়, পরিচালন সক্ষমতা ও নগদ প্রবাহের দুর্বলতা আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আয় থেকে ঋণের কিস্তি ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত সরকারি সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোর আয় বাড়ানো ও ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর, সেগুলোর ক্ষেত্রে পুনর্গঠন, মালিকানা কাঠামো পরিবর্তন কিংবা কার্যক্রম বন্ধের মতো বিকল্প বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ছয় দিন পর উৎপাদন বন্ধ, তিন দশকেও চালু হয়নি ঢাকা লেদার
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অকার্যকারিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড। ১৯৯৬ সালে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন এবং বিক্রির উদ্দেশ্যে সরকারি মালিকানায় প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু কাঁচামাল সংকটের কারণে উৎপাদন শুরুর মাত্র ছয় দিন পরই কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকারি অর্থে পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে কোনো কার্যকর উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে সরকারি অর্থ ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একটি প্রতিষ্ঠান চালুর আগে কাঁচামালের প্রাপ্যতা, বাজারের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা না হলে বড় বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
ঢাকা লেদারের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখন প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সম্পদ কীভাবে কাজে লাগানো হবে এবং প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, অকার্যকর সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে অনির্দিষ্টকাল একই অবস্থায় রেখে পরিচালন ব্যয় বহন করার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
টেলিটক ও ছাতক সিমেন্টেও আর্থিক সংকট
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডও আর্থিক চাপে রয়েছে। গ্রাহকসংখ্যা ও আয়ের দিক থেকে বেসরকারি প্রতিযোগীদের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটি পিছিয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অতি উচ্চ ঋণঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাতেও রয়েছে টেলিটক।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে বলে সূত্রের তথ্য। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পরিচালিত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের লোকসান দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সেবার মান বজায় রাখার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে, ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কারখানাটি সংস্কারে গত এক দশকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
এ ধরনের উদাহরণ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও সংস্কার কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে ফিরতে না পারলে সেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান এবং ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আর্থিক ও পরিচালন নিরীক্ষার মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব, কোনটির ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তন প্রয়োজন এবং কোনটির কার্যক্রম বন্ধ করা যুক্তিযুক্ত—তা নির্ধারণ করা দরকার।
২৪টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক দুর্দশায়, একাংশে একাধিক ঝুঁকি
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪টি অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি আবার অতি উচ্চ ঋণঝুঁকির তালিকাতেও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন
- বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন
- কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড
- ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড
- ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড
- গাজী ওয়্যারস লিমিটেড
- পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ
- রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড
- সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড
- ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ
- উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড
- বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নিট আয়, পরিচালন মুনাফা ও পরিচালন নগদ প্রবাহে নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ভর্তুকি, অনুদান অথবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে আর্থিক দুর্দশা ও অতি উচ্চ ঋণঝুঁকি একই বিষয় নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসান করলেও তার সম্পদ, ভবিষ্যৎ আয় বা রাষ্ট্রীয় কৌশলগত গুরুত্ব থাকতে পারে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ বেশি হলেও তার কার্যক্রম ও নগদ প্রবাহের প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে। তাই সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে পৃথক মূল্যায়নের ভিত্তিতে সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।
৩৯টি হাই-টেক পার্ক, প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসেনি
প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সরকার ৩৯টি হাই-টেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ করেছে। তবে এসব পার্ক থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের আর্থিক দুরবস্থাও সামনে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১৮ কোটি টাকা লোকসান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এবং পার্কগুলোকে বিনিয়োগের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার সঙ্গে লোকসানের সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জানান, বিগত সরকার পার্কগুলোতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করলেও সেসব পরিকল্পনা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যশোর, চট্টগ্রাম ও নাটোরের তিনটি পার্ক ছাড়া বাকি পার্কগুলোকে এখনো বিনিয়োগের উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়নি।
তিনি জানান, বিদ্যমান ও নির্মাণাধীন পার্কগুলোকে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় এবং বাস্তবসম্মত করে তোলার চেষ্টা চলছে।
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং পরিচালন পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পার্ক নির্মাণ করলেই সেখানে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বা প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
সরকারি ঋণের গ্যারান্টি বাড়াচ্ছে আর্থিক ঝুঁকি
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট শুধু তাদের নিজস্ব হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে এর দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরও বর্তায়। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া ঋণের বিপরীতে সরকার প্রায়ই সার্বভৌম গ্যারান্টি দেয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দায় সরকারের ওপর পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নকে জাতীয় বাজেট ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সরকারি অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আয় থেকে পরিচালন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধ করতে পারে না, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত লোকসান দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি ও উন্নয়ন সহায়তাসহ এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
এই পরিসংখ্যান রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুরবস্থার ব্যাপ্তি এবং সরকারি সহায়তার পরিমাণ সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করছে। লোকসান পূরণে বারবার অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়ানো, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে একই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে।
বেতন-ভাতা বাড়লে বাড়বে পরিচালন ব্যয়ের চাপ
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোরই নিজস্ব আয় নেই বা আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসরকালীন সুবিধা ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় সরকারের সহায়তায় মেটানো হয়।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে যেসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আয় দিয়ে ব্যয় নির্বাহ করতে পারে না, সেগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত ব্যয় কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জনবল, বেতন কাঠামো এবং নতুন বেতন-ভাতা কার্যকরের শর্তের ওপর।
বড় জনবল থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত—এমন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। ফলে ব্যয় বৃদ্ধি সামাল দিতে অতিরিক্ত অনুদান বা ভর্তুকির প্রয়োজন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান কৌশলগত কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকা প্রয়োজন, সেগুলোর আর্থিক ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লাভজনক হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে মালিকানা হস্তান্তর, বেসরকারি ব্যবস্থাপনা, পুনর্গঠন কিংবা বন্ধের বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা বা পুনর্গঠন করা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এতে কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের অধিকার, সরকারি সম্পদের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আর্থিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
‘সরকারের আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধে সামগ্রিক সংস্কার জরুরি’
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমানো এবং আর্থিক দায় নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের কয়েকটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে লোকসান করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিবছর জাতীয় বাজেট থেকে ভর্তুকি, অনুদান বা ঋণ সহায়তা দিতে হচ্ছে। এতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সরকারের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সরকারের জন্য আর্থিক রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সামগ্রিক সংস্কার পরিকল্পনা করা জরুরি।
তিনি মনে করেন, সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের সমাধান কার্যকর হবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে, কোনোটি সরকারি মালিকানায় রেখে ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেওয়া যেতে পারে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ জমি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে, সেগুলো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংস্কারের লক্ষ্য শুধু সরকারি ব্যয় কমানো হওয়া উচিত নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, সেবার মান উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধ, পুনর্গঠন নাকি বেসরকারি ব্যবস্থাপনা—সিদ্ধান্তের সময় এখনই
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন ও বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। যেসব প্রতিষ্ঠান কৌশলগত কারণে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন, সেগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনক্ষমতা ও সেবার মান উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা সীমিত, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।
এ জন্য প্রথমে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, ঋণের দায়, সরকারি সহায়তার পরিমাণ, সম্পদের মূল্য এবং ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা নিরূপণ করতে হবে। এরপর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে লোকসানের কারণ চিহ্নিত করা, প্রকল্প বাস্তবায়নের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে কী পরিমাণ উৎপাদন, আয় বা জনসেবা পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘদিন একই কাঠামোয় পরিচালনা করে শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে লোকসান পূরণ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং এতে ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর দায় বাড়তে থাকবে। তাই আর্থিক শৃঙ্খলা, সুশাসন, সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং বাস্তবসম্মত পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই করার উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে।

