বাড়ছে যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা, কিন্তু তাল মেলাতে পারছে না জনবল ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম। ট্রলি সংকট, লাগেজ সরবরাহে বিলম্ব, দীর্ঘ লাইন ও টার্মিনালে অতিরিক্ত ভিড়ে ক্ষুণ্ন হচ্ছে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সেবার মান। তৃতীয় টার্মিনাল ঘিরে বড় পরিকল্পনার মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—শুধু অবকাঠামো সম্প্রসারণেই কি কাটবে সংকট?
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণে বিমান চলাচল অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করছে। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরেও রয়েছে আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা। তবে ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপের বিপরীতে সেবার ঘাটতি, লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, ট্রলির সংকট, টার্মিনালে উপচে পড়া ভিড় এবং নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিমানবন্দরের সেবার মান নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এভিয়েশন পর্যালোচনা ও রেটিং সংস্থা স্কাইট্র্যাকসের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও। সংস্থাটির মূল্যায়নে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পেয়েছে দুই-তারকা রেটিং। যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বসার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার ধীরগতির মতো বিষয়গুলো বিমানবন্দরের সেবার দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা শুধু যাত্রীদের সাময়িক ভোগান্তির বিষয় নয়। বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের কাছে বিমানবন্দরই বাংলাদেশের প্রথম অভিজ্ঞতা। সেখানে অব্যবস্থাপনা ও নিম্নমানের সেবা দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। ফলে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান, জনবল, সরঞ্জাম ও পরিচালনব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
গত ১ অক্টোবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরে ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ডেন্টিস্ট ডা. ওরাকাতুল জান্নাত নিজের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন।
তার বর্ণনা অনুযায়ী, সকাল ৯টার কিছুক্ষণ আগে তার ফ্লাইট অবতরণ করলেও একটি লাগেজ ট্রলি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। পরে লাগেজ হাতে পান বেলা সাড়ে ১১টার দিকে—অর্থাৎ বিমান অবতরণের প্রায় তিন ঘণ্টা পর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি দীর্ঘ লাইন, পর্যাপ্ত বসার জায়গার অভাব এবং বয়স্ক যাত্রী ও শিশুদের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন। তার অভিজ্ঞতা বিমানবন্দরের ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রাপ্যতা এবং টার্মিনালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে এ ধরনের ভোগান্তি যে শুধু একজন যাত্রীর অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় অন্য ঘটনাতেও। মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি৩৩৮ ফ্লাইটের ওমরাহযাত্রীরা লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়।
পরবর্তী সময়ে লাগেজ সরবরাহে বিলম্বের ঘটনায় বিরোধী দলের চারজন সংসদ সদস্য বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান এবং বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
একাধিক ঘটনায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় বিমানবন্দরের সেবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে দ্রুত লাগেজ সরবরাহ এবং পর্যাপ্ত ট্রলি নিশ্চিত করতে না পারা যাত্রীসেবার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সাবেক এয়ারলাইন কর্মকর্তা ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ টি এম নজরুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, একজন যাত্রী হয়তো উড়োজাহাজের ধরন কিংবা ফ্লাইট নম্বর ভুলে যেতে পারেন। কিন্তু লাগেজ পেতে বা একটি ট্রলি খুঁজতে যদি তাকে অকারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, সেই ভোগান্তিই বাংলাদেশে পৌঁছানোর স্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। যাত্রীরা বিমানবন্দরে কতটা স্বাচ্ছন্দ্য ও দক্ষতার সঙ্গে সেবা পাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা একটি দেশের পরিবহনব্যবস্থার দক্ষতা, ব্যবস্থাপনার মান ও যাত্রীবান্ধব মনোভাবের পরিচায়ক। তাই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভাবমূর্তি উন্নত করতে হলে যাত্রীদের প্রবেশ, ইমিগ্রেশন, ব্যাগেজ সংগ্রহ এবং টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার প্রতিটি ধাপে সেবার মান বাড়াতে হবে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৬টি এয়ারলাইন্স প্রায় ১৪০ থেকে ১৬০টি ফ্লাইট পরিচালনা করে। এসব ফ্লাইটে দৈনিক প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৩৬ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।
যাত্রীসংখ্যা ও ফ্লাইটের এই চাপ সামলাতে বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর পর্যন্ত দেশে আসা যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। অন্যদিকে সন্ধ্যা ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দেশ ছাড়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ভিড় বাড়ে।
ব্যস্ত সময়ে কখনো কখনো একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারে। এতে একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ যাত্রী টার্মিনালে প্রবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক যাত্রীর ইমিগ্রেশন, লাগেজ সংগ্রহ ও টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া সামলাতে গিয়ে ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামিয়ে যাত্রীদের হাতে পৌঁছে দিতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
এখানে সমস্যা শুধু যাত্রীসংখ্যা বেশি হওয়া নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রীদের চাপ সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, সরঞ্জাম ও সমন্বিত কার্যক্রম কতটা প্রস্তুত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিমানবন্দরের সক্ষমতা মূল্যায়নে রানওয়ে বা উড়োজাহাজ ওঠানামার সংখ্যা বিবেচনা করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
বিমানবন্দরটিতে যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য মোট ৪ হাজার ১৯০টি ট্রলি রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৭টি ব্যবহারযোগ্য বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ সব ট্রলি একসঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব নয়; কিছু ট্রলি মেরামত বা অন্য কারণে ব্যবহারের বাইরে রয়েছে।
ট্রলির সংকট কমাতে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছে আরও ৫০০টি ট্রলির অর্ডার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এসব ট্রলি পাওয়ার কথা রয়েছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ টিবিএসকে বলেন, ব্যাগেজ সরবরাহ দ্রুত করতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে আরও বেশি হেল্পার মোতায়েন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, লাগেজ সরবরাহে বিলম্ব হলে ট্রলিও দীর্ঘ সময় যাত্রীদের কাছে আটকে থাকে। ফলে একটি ট্রলি ব্যবহারের পর দ্রুত নির্ধারিত স্থানে ফিরিয়ে এনে অন্য যাত্রীর জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ট্রলির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
ট্রলিগুলো যাতে দ্রুত ব্যবহারের নির্ধারিত স্থানে ফিরিয়ে আনা যায়, তা তদারকির জন্য একজন কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে শুধু নতুন ট্রলি যুক্ত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ট্রলি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি লাগেজ দ্রুত সরবরাহ, ট্রলি সংগ্রহ ও ফেরত দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা এবং ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত কর্মী মোতায়েনও জরুরি।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তার প্রকৃত ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা এখন গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তার মতে, একটি বিমানবন্দরের সক্ষমতা শুধু রানওয়ে, উড়োজাহাজ পার্কিং স্ট্যান্ড কিংবা ফ্লাইট ওঠানামার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। বিমানবন্দরের বিভিন্ন সেবা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি অংশে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য অংশেও পড়ে।
যেমন, দেশে আসা যাত্রীদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে লাগেজ সংগ্রহের পর টার্মিনাল থেকে বের হতে হয়। একই সময়ে বিদেশগামী যাত্রীরা টার্মিনালে প্রবেশ করে চেক-ইন, নিরাপত্তা তল্লাশি ও বোর্ডিংয়ের প্রস্তুতি নেন। ফলে আগমন ও বহির্গমন—দুই ধরনের যাত্রীর চাপ একই সময়ে সামলাতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে রানওয়েতে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ থাকলেও ইমিগ্রেশন কাউন্টার, নিরাপত্তা তল্লাশি, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, টার্মিনালের বসার জায়গা কিংবা গ্রাউন্ড সার্ভিসেসের সক্ষমতা সীমিত হলে পুরো কার্যক্রমে জট তৈরি হতে পারে।
এ কারণে অতিরিক্ত ফ্লাইটের চাপ সামলানোর মতো সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। তা না হলে একের পর এক বিলম্বের কারণে উড়োজাহাজের পরবর্তী ফ্লাইট পরিচালনা বা টার্নঅ্যারাউন্ডে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে এবং যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
ওই বেবিচক কর্মকর্তা ব্যস্ত সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এ মূল্যায়নে রানওয়ে, অ্যাপ্রন, টার্মিনাল, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাউন্ড সার্ভিসেস—সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যাত্রী ও বোর্ডিং ব্যবস্থাপনা, লাগেজ ও কার্গো পরিবহন, উড়োজাহাজকে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রতিষ্ঠানটিকে সামলাতে হয়।
এয়ারলাইন্স অপারেটরস কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য এয়ারলাইন্সগুলো বিমানকে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করে। এ ছাড়া কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ০.০৭ ডলার দেওয়া হয়।
এত অর্থ পরিশোধের পরও সেবার মান ও কার্যকারিতা নিয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশেষ করে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মী ও কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমান এয়ারপোর্ট সার্ভিসেসের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীর সংখ্যা বাড়েনি। আগে যেসব এয়ারলাইন্স দিনে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করত, তাদের কেউ কেউ এখন চার থেকে ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এতে কর্মীদের ওপর কাজের চাপ বেড়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জনবল নিয়ে আলোচনায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মীর যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়, তা পুরো কার্যক্রমের কর্মীসংখ্যার সঠিক প্রতিফলন নয়। কারণ যাত্রী কাউন্টার, ট্রানজিট ও অন্যান্য শাখার কর্মীরা আলাদা দায়িত্ব পালন করেন। তার ধারণা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে প্রায় ১৬৭ জন নতুন হেল্পার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৮০ জন কর্মী যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আশা, নতুন কর্মীরা কাজে যোগ দিলে ব্যাগেজ সরবরাহের গতি ও সেবার মান উন্নত হবে।
তবে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন, শিফট ব্যবস্থাপনা, সরঞ্জামের প্রাপ্যতা এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শুধু নিয়োগ বাড়িয়ে ব্যস্ত সময়ে সেবার ঘাটতি পুরোপুরি কাটানো কঠিন হতে পারে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ঘিরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে দ্বিতীয় একটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এর ফলে যাত্রী ব্যবস্থাপনায় বিমানের একক আধিপত্য কমবে এবং এয়ারলাইন্সগুলো নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী অপারেটর বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে কার্গো ব্যবস্থাপনার একক অধিকার বিমানের কাছেই রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
মেনজিস এভিয়েশন, চেলেবি এভিয়েশন, ডিনাটা ও সুইসপোর্টের মতো আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক অপারেটর যুক্ত হলে সেবার মান, কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিযোগিতা কার্যকর করতে হলে দায়িত্ব ও সেবার মান নির্ধারণ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কার্যক্রম তদারকির জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নতুন অপারেটর যুক্ত হওয়ার ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়, দায়িত্ব বণ্টন এবং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রতিযোগিতা থাকলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রীসেবার মান বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়; সেবার মান পরিমাপ ও জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
যাত্রীসংখ্যার ধারাবাহিক বৃদ্ধি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর চাপ আরও বাড়াচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিমানবন্দরটি প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রীকে সেবা দিয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ। ২০২৫ সালের মোট যাত্রীর মধ্যে আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিলেন প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার।
এই পরিসংখ্যান বলছে, বিমানবন্দরটির ওপর যাত্রীচাপ ক্রমেই বাড়ছে। যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, টার্মিনালের জায়গা এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালকে বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় ৫ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডল করার সক্ষমতা নিয়ে নকশা করা হয়েছে। এই সম্প্রসারণ বিমানবন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নতুন টার্মিনাল চালু করা বা অবকাঠামো বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক সরঞ্জাম, কার্যকর ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ গ্রাউন্ড সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অবকাঠামো বাড়লেও সেবার ঘাটতি পুরোপুরি দূর নাও হতে পারে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিমানবন্দরের সক্ষমতা কি শুধু ফ্লাইট পরিচালনা ও যাত্রীসংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা হবে, নাকি যাত্রী কত দ্রুত, নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা পাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্ব পাবে?
লাগেজ সরবরাহে বিলম্ব, ট্রলির অপ্রতুলতা, দীর্ঘ লাইন ও টার্মিনালে ভিড়ের মতো সমস্যার সমাধান করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে পুরো ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। ব্যস্ত সময়ে কতটি ফ্লাইট ও যাত্রী সামলানো সম্ভব, কোথায় জনবল বা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে এবং কোন পর্যায়ে জট তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয় নিয়মিত বিশ্লেষণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সেবার মান পর্যবেক্ষণ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাগেজ সরবরাহ, পর্যাপ্ত ট্রলি নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এসব সূচকের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগ করছে, তখন সেই বিনিয়োগের সুফল যাত্রীদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হওয়াই প্রত্যাশিত। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে তাই অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিচালনাগত দক্ষতা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

