বাব আল-মান্দেব ঘিরে তীব্র লড়াই; সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় সরকারি বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতি, দাবি অস্বীকার হুতিদের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রান্তকাল
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা (Mokha/Mocha) ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনীর কাছ থেকে পুনর্দখলের দাবি করেছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সশস্ত্র বাহিনী। সৌদি আরবের বিমান সহায়তায় পরিচালিত বড় ধরনের পাল্টা অভিযানের মধ্যে সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়েছে।
তবে মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি পাওয়া যাচ্ছে। ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শহরটি তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ঘোষণা দিলেও হুতিরা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে কিছু সামরিক সূত্র জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী শহরটির সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করে ঘিরে ফেললেও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ফলে মোখার সর্বশেষ নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা বজায় রয়েছে।
সেপ্টেম্বরেই মোখা দখল করেছিল হুতিরা
ইয়েমেনের সরকারি বার্তা সংস্থা সাবার বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুতি বাহিনী মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। এরপর সোমবার তীব্র লড়াইয়ের পর সরকারপন্থী বাহিনী শহরটি পুনর্দখল করেছে বলে দাবি করা হয়।
অভিযানে ন্যাশনস শিল্ড ফোর্সেস, জায়ান্টস ব্রিগেডস ও তিহামা রেজিস্ট্যান্সসহ সরকারপন্থী একাধিক বাহিনী অংশ নেয়।
সরকারি পক্ষের দাবি, শহরের আশপাশে একাধিক অবস্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। হুতি যোদ্ধাদের হতাহত ও কয়েকজনকে আটক করার কথাও বলা হয়েছে। তবে হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ মোখা?
মোখার গুরুত্ব শুধু একটি বন্দরনগরী হিসেবে নয়। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত।
এই সরু জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে।
ফলে বাব আল-মান্দেবের আশপাশে কোনো পক্ষের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু ইয়েমেনে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি পরিবহন ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় দ্রুত অগ্রগতি
Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী সোমবার বাব আল-মান্দেবের আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অভিযান চালায়।
ভারী সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় সরকারি বাহিনী মোখার উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সরকারি সূত্রগুলো দাবি করেছে, চাপের মুখে হুতি যোদ্ধাদের একটি অংশ উপকূলীয় অবস্থান ছেড়ে পাহাড়ি এলাকার দিকে সরে যায়।
সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেবের মুখে অবস্থিত ধুবাব (Dhubab) এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিসহ বেশ কয়েকটি অবস্থান দখল করেছে বলেও জানা গেছে।
AP-র প্রতিবেদনে সরকারপন্থী বাহিনীর ধুবাব ও আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখলের তথ্য পাওয়া গেছে।
হুতিদের পাল্টা হামলার দাবি
স্থলযুদ্ধে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির খবরের মধ্যেই হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে।
তাদের দাবি করা লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাবিঘে সৌদি আরামকোর একটি শোধনাগার, আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটি।
তবে এসব হামলার দাবি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। Reuters জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ ও আরামকোর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে সব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।
নতুন করে বিস্তৃত হচ্ছে ইয়েমেন যুদ্ধ
দীর্ঘদিনের ইয়েমেন সংঘাত সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এখন হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তাদের অভিযানের লক্ষ্য শুধু পশ্চিম উপকূল নয়; হুতি নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড পুনর্দখলের বৃহত্তর সামরিক পরিকল্পনাও রয়েছে।
হুতিরা ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে যুদ্ধে নামে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর বড় আকারের সংঘর্ষ অনেকটা কমে এলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যুদ্ধ আবার বিস্তৃত হচ্ছে।
মোখা নিয়ে এখনো পাল্টাপাল্টি দাবি
সরকারের পক্ষ থেকে মোখা পুনর্দখলের ঘোষণা দেওয়া হলেও হুতিরা সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির দাবি অস্বীকার করেছে।
একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাতে মোখা দখলের ঘোষণা উল্লেখ করা হলেও ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে।
অন্যদিকে AFP-কে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সামরিক সূত্রগুলো বলেছে, সরকারপন্থী বাহিনী মোখার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করলেও শহরটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সরকারি ঘোষণাটি তারা তখনও নিশ্চিত করেনি।
এ কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার মধ্যে মোখা বর্তমানে কার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে—তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে।
লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় বড় প্রভাব
মোখা ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে চলমান লড়াইয়ের ফলাফল আঞ্চলিক যুদ্ধের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সরকারি বাহিনী যদি মোখাসহ বাব আল-মান্দেবের আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চল স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর হুতিদের সরাসরি ভৌগোলিক প্রভাব কমতে পারে।
তবে দূরবর্তী অবস্থান থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে জাহাজে হামলার সক্ষমতা হুতিদের থাকতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সতর্ক করা হচ্ছে।
ফলে মোখার যুদ্ধ শুধু ইয়েমেনের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের লড়াই নয়—লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

