দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল মানুষের মাথা গোঁজার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা নয়; বরং পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা সংবলিত মর্যাদাপূর্ণ বাসস্থান নিশ্চিত করা।
সোমবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’।
শুধু ঘর নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক সুবিধা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি বাসস্থানকে প্রকৃত অর্থে বাসযোগ্য করতে নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন, উন্নত সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসবের সমন্বয়েই নাগরিকের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সম্মানের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে হবে।
ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নগর ও শহরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত মানুষের বসবাস নগরজীবনে আবাসন, পরিবহন ও নাগরিক সেবাসহ বহুমুখী সংকট সৃষ্টি করছে।
এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণের পরিবর্তে বিকেন্দ্রীভূত ও ভারসাম্যপূর্ণ নগর এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। রাজধানী ও বড় শহরগুলোর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুবিধা বাড়ানো এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের আবাসনে বিশেষ গুরুত্ব
তারেক রহমান বলেন, পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থা সরকারের পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সীমিত আয়ের মানুষের আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণ বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, পরিকল্পিত নগরায়নের লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন ও জেলাগুলোর জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।
এসব উদ্যোগ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১১ নম্বর অভীষ্ট—অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী জানান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সারাদেশের জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বেসরকারি আবাসন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ চান প্রধানমন্ত্রী
দেশের আবাসন সংকট শুধু সরকারের একার পক্ষে মোকাবিলা করা কঠিন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি আবাসন উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ দেশের আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে ব্লকভিত্তিক আবাসন উৎসাহিত করা, এলাকাভিত্তিক পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরি এবং নির্ধারিত জোনে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারের গৃহীত পরিকল্পনাগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাস্তবে রূপ নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিন দিনব্যাপী আবাসন মেলা
বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের লবিতে তিন দিনব্যাপী আবাসন মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি স্বর্ণচাঁপা গাছের চারা রোপণ করেন। পরে বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে নির্মিত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেচনিয়াক।

