সরকারি সেবা পেতে একজন নাগরিককে যেন একাধিক দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সে লক্ষ্যে সমন্বিত, সহজ ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, নাগরিকের প্রয়োজন ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনের কর্মঅধিবেশনের একটি সেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত, যাতে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে একাধিক সরকারি দপ্তরে ঘুরতে না হয়। নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে বিভিন্ন সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ও যথাযথ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে হবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সেবা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাগরিকের দুর্বলতা, আর্থসামাজিক সংকট ও বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করে সময়মতো সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া গেলে সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সহজ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণের পর বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এর প্রথম ১০ বছর অতিক্রম করেছে। এ সময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের চেষ্টা করছে।
এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বিদ্যমান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে আরও বাস্তবসম্মত করা প্রয়োজন।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। পাশাপাশি সহায়তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষা দয়া নয়, নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার মাধ্যম
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এসব কর্মসূচিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দয়া বা করুণা বিতরণের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের মানবিক মর্যাদা রক্ষা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করা।
তিনি বলেন, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নাগরিকদের সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করার পাশাপাশি তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পারে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে তা মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি ও দুর্বলতার মুখে থাকা নাগরিকদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সেবা প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে সামাজিক সুরক্ষাকে মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর আয়োজন করেছে। সম্মেলনে বিভিন্ন সমসাময়িক নীতি, শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের কর্মঅধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে জহির উদ্দিন স্বপন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সমন্বয়, সরকারি সেবা সহজীকরণ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নাগরিকবান্ধব, সমন্বিত ও কার্যকর করতে হবে, যাতে মানুষ প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পেতে অযথা হয়রানি বা দীর্ঘসূত্রতার মুখে না পড়ে।

