রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে সরকার: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার, পেশাগত মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন এবং দশম ওয়েজবোর্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গতকাল রোববার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকরা জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের পেশাগত সুরক্ষা, কল্যাণ ও যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে পেশাদার সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তিদের সাংবাদিকতা পেশায় আসার আগ্রহও কমে যেতে পারে।

নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন ও দশম ওয়েজবোর্ড নিয়ে আলোচনা

ওয়েজবোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কথা তুলে ধরে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, নবম ওয়েজবোর্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, দশম ওয়েজবোর্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের দাবিও রয়েছে। ফলে নতুন ওয়েজবোর্ডের দাবি বিবেচনার পাশাপাশি আগের ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হচ্ছে।

তিনি জানান, এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে। সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি মন্ত্রিসভায় তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়েজবোর্ড নিয়ে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে সরকার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে সভায় নির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

গণমাধ্যম মালিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে

সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের মালিকদের ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার কোনো ঘোষণা দিলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না, যদি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো তা বাস্তবায়নে আন্তরিক না হয়।

তাঁর মতে, সাংবাদিকদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার ও গণমাধ্যম মালিকপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

প্রকৃত সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণের আহ্বান

সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পেশাদার সাংবাদিকতা করে আসা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া কিছু ব্যক্তির কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। এ পরিস্থিতি জনগণের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান। কারা সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত হবেন, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নির্ধারণে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর মতামত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সভায় ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমও এ বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ খুলে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করেন।

সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রস্তাব বিবেচনা

সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, এ আইনের উদ্দেশ্য গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা সাংবাদিকদের লেখালেখি বন্ধ করা নয়; বরং জনগণকে নিরাপদ রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে হয়রানি, অসত্য তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে মানুষের ক্ষতি করার ঘটনা মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ ভুলবশত আইনের ব্যত্যয় ঘটালে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব এসেছে। সরকার প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শব্দচয়ন ও বিধান কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। গণমাধ্যম কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সরকার হস্তক্ষেপ করতে চায় না। সাংবাদিকরা যাতে স্বাধীনভাবে তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

লিখিত প্রস্তাব দিতে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আহ্বান

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উত্থাপিত দাবি-দাওয়াগুলো লিখিতভাবে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তথ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দাবিগুলো লিখিত আকারে পাওয়া গেলে সেগুলো পর্যালোচনা, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যাচাই এবং পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা সরকারের জন্য সহজ হবে।

একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ ধরনের মতবিনিময় অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সাংবাদিকদের পেশাগত সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার দাবি ডিইউজের

মতবিনিময় সভায় ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকরা দিনরাত পরিশ্রম করে জনগণের সামনে দেশের খবর তুলে ধরেন। অনেক ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ অনেক সাংবাদিক ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতির অবসানে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ডিইউজের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম দিদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন না হওয়ায় সাংবাদিকরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি অবিলম্বে দশম ওয়েজবোর্ড ঘোষণার দাবি জানান।

এ ছাড়া যেসব পত্রিকা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করে না, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সভায় উপস্থিত ছিলেন ডিইউজের নেতৃবৃন্দ

সভায় ডিইউজের সহসভাপতি রাশেদুল হক, দপ্তর সম্পাদক ইকবাল মজুমদার তৌহিদ, কল্যাণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন রাজ্জাক, প্রচার সম্পাদক আবুল কালাম, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক রফিক লিটন, নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ গাজী আনোয়ার এবং তালুকদার এ এইচ এম নুরুল মোমেনসহ সংগঠনটির অন্য নেতারা বক্তব্য দেন।

এ সময় ডিইউজের সিনিয়র সহসভাপতি রফিক মোহাম্মদ, নির্বাহী সদস্য এম. মোশররফ হোসাইন, আবদুল্লাহ মজুমদার, ফখরুল ইসলামসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও কল্যাণ, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের বাধা দূর করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাসের পর এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর রয়েছে আলোচনার অগ্রগতি ও বাস্তব পদক্ষেপের দিকে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন