৭২ ঘণ্টায় হুতি অবস্থানে ১০১ অভিযানের দাবি • রিয়াদমুখী ড্রোন ও খামিস মুশাইতমুখী ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত • ইয়ানবু রক্ষায় ফরাসি সেনা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা • রিয়াদের কিছু স্কুলে অনলাইন ক্লাস
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬:
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরব-সমর্থিত পক্ষের সংঘাত নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে। একদিকে সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে হুতিরা, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতি অবস্থানের বিরুদ্ধে বিমান ও স্থল অভিযান জোরদার করেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের কৌশলগত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে সরাসরি প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে ফ্রান্স। ইয়ানবু তেলবন্দর সুরক্ষায় দেশটিতে ফরাসি সেনা, রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করা হচ্ছে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, এই সহায়তা ‘কঠোরভাবে প্রতিরক্ষামূলক’।
৭২ ঘণ্টায় ১০১ অভিযান
ইয়েমেনের সরকারপন্থী সেনাবাহিনীর দাবি, গত ৭২ ঘণ্টায় হুতিদের বিভিন্ন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ১০১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ফিল্ড আর্টিলারি ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, অভিযানে হুতিদের বেশ কিছু সামরিক সরঞ্জাম, সেনা পরিবহনযান ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস বা অকার্যকর করা হয়েছে। চারজন ইরানি ড্রোন বিশেষজ্ঞ নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে ইয়েমেনি বাহিনী। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তায়েজ প্রদেশে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান ও স্থল অভিযান সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছে সরকারপন্থী বাহিনী। গত ২৪ ঘণ্টায় প্রদেশটির অন্তত পাঁচটি স্থানে হুতি অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলার দাবি করেছে তাদের সামরিক মিডিয়া সেন্টার।
সৌদিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র
ইয়েমেনের ভেতরের লড়াইয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবেও হামলা অব্যাহত রেখেছে হুতিরা।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, শনিবার ভোরে রিয়াদ অঞ্চলের দিকে পাঠানো দুটি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহরের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করার দাবি করেছে জোট।
এর মাত্র দুই দিন আগে ইয়ানবু ও তায়েফের দিকে হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি করেছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
সৌদি আরবের জন্য বিশেষ উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে ইয়ানবু। লোহিত সাগর তীরবর্তী এই বন্দর দেশটির জ্বালানি রপ্তানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক সংঘাতে হুতিরা সৌদি জ্বালানি স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে দাবি করেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর হুতিদের সৌদি স্থাপনায় হামলার দাবির পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
রিয়াদের কিছু স্কুলে অনলাইন ক্লাস
নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রভাব সৌদি রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে শুরু করেছে। রিয়াদের কয়েকটি স্কুল অভিভাবকদের জানিয়েছে, রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ক্লাস অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে।
তবে সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় শহরজুড়ে স্কুল বন্ধ বা অনলাইন শিক্ষার কোনো সাধারণ নির্দেশনা প্রকাশ করেনি। স্কুলগুলোও সিদ্ধান্তের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। এর আগের দিনই রিয়াদের দিকে আসা দুটি হুতি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
সৌদির পাশে ফ্রান্স
হুতি হামলা বৃদ্ধির মধ্যে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ফ্রান্স সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, সৌদি আরবকে দেওয়া সহায়তার মধ্যে ফরাসি সেনা, রাডার ইউনিট ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ইয়ানবু এলাকার সুরক্ষায়।
প্যারিস বলছে, এই মোতায়েন আক্রমণাত্মক অভিযানের জন্য নয়; সৌদি আরবকে হুতি হামলা মোকাবিলায় সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।
নতুন করে বড় যুদ্ধের শঙ্কা
ইয়েমেনে হুতি ও সরকারপন্থী বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে স্থবির থাকার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল হুতিদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং পক্ষত্যাগকারী হুতি সদস্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাব দিয়েছে।
হুতিদের হামলা শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে সৌদি শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় সংঘাতটির আঞ্চলিক মাত্রা আরও বেড়েছে।
এর মধ্যে ফ্রান্সের সরাসরি প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা এবং সৌদি আরবের মিত্রদের মধ্যে সামরিক সমন্বয়ের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ফলে এখন নজর দুটি দিকে—সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা কতটা বিস্তৃত হয় এবং ইয়েমেনের ভেতরে সরকারপন্থী বাহিনীর নতুন সামরিক অভিযান হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

