নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সারা বছর বাজার নজরদারি আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, শুধু রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নয়, বছরজুড়েই নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসায়ী সংগঠন, আমদানিকারক, উৎপাদক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো হবে বলেও জানান তিনি।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো বা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সভায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী নেতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তবে সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা মৌসুমকেন্দ্রিক নয়। সারা বছর পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্য সাধারণ মানুষের সহনীয় পর্যায়ে রাখাই সরকারের লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির কারণ তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাব কয়েকটি এলাকার বাজারেও পড়েছে।
তবে শীতকাল সামনে থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সবজি বাজারে আসতে শুরু করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এতে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পণ্যের দামে দুই-চার টাকার অস্বাভাবিক ওঠানামা সামগ্রিক হিসাবে খুব বড় মনে না হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাজার নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি ভোক্তাদের আস্থা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারে মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
এ ছাড়া আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। দেশে উৎপাদিত পণ্য এবং যেসব পণ্যের ঋণপত্র (এলসি) ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে বা জাহাজীকরণের পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর তথ্যও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজার ও ব্যবসা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যমান কর কাঠামোর বিভিন্ন দিকও পর্যালোচনা করা হবে।
সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিস্থিতি ইতিবাচক রয়েছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মসুর ডালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টন। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ছয় হাজার মেট্রিক টনে।
ভোজ্যতেলের কাঁচামাল বা সিড আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে দুই লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন সিড আমদানি করা হলেও চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে তিন লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।
দেশে বছরে চিনির চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসেই প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন চিনির চাহিদা তৈরি হয়। তবে সামগ্রিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও পাইপলাইন পরিস্থিতি ইতিবাচক রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশকেও এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয়। সরকার ভোক্তাদের ওপর সেই চাপ একবারে না দিয়ে এর একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই জ্বালানির দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ট্রেসেবিলিটি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পণ্যের সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ডিম ও পোল্ট্রিসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যকে এ কার্যক্রমের আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সভায় জানানো হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, যৌক্তিক মূল্য বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের আস্থা শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতি প্রণয়নে ব্যবসায়ী নেতাদের পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভায় ব্যবসায়ী নেতারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, সরবরাহ ও বাজারমূল্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম এবং ডাল, তেল, খেজুর, ডিম ও চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

