এআই ও রোবোকলেও নজরদারি • Truecaller-এর আপত্তি • স্বয়ংক্রিয় কলের তথ্য আগেই জানাতে হবে অপারেটরকে
প্রযুক্তি ডেস্ক
স্প্যাম ও প্রতারণামূলক ফোনকল ঠেকাতে টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে ভারত। এখন থেকে যেসব কলার-আইডি বা কল-ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ ব্যবহারকারীদের কোনো নম্বরকে ‘স্প্যাম’ বা ‘জাঙ্ক’ হিসেবে রিপোর্ট করার সুযোগ দেয়, সেই রিপোর্ট টেলিকম অপারেটরদের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় পাঠাতে হবে।
ভারতের টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অব ইন্ডিয়া (TRAI) ১৮ সেপ্টেম্বর ‘Telecom Commercial Communications Customer Preference (Third Amendment) Regulations, 2026’ প্রকাশ করে। স্প্যাম ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা এবং গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার করাই এর লক্ষ্য বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অ্যাপে রিপোর্ট করলেও পৌঁছাবে টেলিকম ব্যবস্থায়
নতুন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, কলার-আইডি ও কল-ম্যানেজমেন্ট অ্যাপে ব্যবহারকারীদের করা স্প্যাম রিপোর্টকে টেলিকম খাতের স্প্যাম প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা।
এর ফলে শুধু কোনো অ্যাপের নিজস্ব ডেটাবেজে অভিযোগ জমা থাকার পরিবর্তে টেলিকম অপারেটররাও সেই তথ্য ব্যবহার করে সন্দেহজনক বা অনাকাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক কলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাবে। ভারতের বিদ্যমান স্প্যাম নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় টেলিকম অপারেটরদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আপত্তি Truecaller-এর
তবে নতুন নিয়ম নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে জনপ্রিয় কলার-আইডি ও স্প্যাম শনাক্তকারী প্রতিষ্ঠান
প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, এ ধরনের বাধ্যতামূলক তথ্য বিনিময় কার্যত একমুখী ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, ব্যবহারকারীদের রিপোর্টের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান তথ্য কল-ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ থেকে টেলিকম অপারেটরদের কাছে চলে যাবে। প্রতিষ্ঠানটি এই ব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ভারত Truecaller-এর সবচেয়ে বড় বাজার। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তাদের ৫০ কোটির বেশি মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর মধ্যে ৩৫ কোটিরও বেশি ভারতে। ২০২৫ সালে দেশটিতে তাদের ব্যবহারকারীরা প্রায় ৪২ বিলিয়ন স্প্যাম কলের মুখোমুখি হয়েছেন বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১২ বিলিয়ন স্প্যাম কল ব্লক করার কথাও জানিয়েছে Truecaller।
এআই ও রোবোকলও নতুন নিয়মের আওতায়
নতুন সংশোধনীতে শুধু প্রচলিত স্প্যাম কল নয়, সফটওয়্যারনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় কলের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
মানুষ সরাসরি নম্বর ডায়াল না করে সফটওয়্যার বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে যেসব কল করা হয়, সেগুলোকে Application-to-Person বা A2P কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে রোবোকল, আগে থেকে রেকর্ড করা কণ্ঠ এবং কৃত্রিম বা এআই-নির্ভর কণ্ঠ ব্যবহার করে করা স্বয়ংক্রিয় কলও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট টেলিকম অপারেটরের কাছে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও ফোন নম্বরের তথ্য আগেই ঘোষণা করতে হবে। নির্ধারিত নিয়ম না মেনে করা A2P কল স্প্যাম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতি মিনিটে সর্বোচ্চ ৫ পয়সা চার্জের সুযোগ
নতুন কাঠামোয় A2P কলের ক্ষেত্রে টেলিকম অপারেটরদের প্রতি মিনিটে সর্বোচ্চ ৫ পয়সা (₹0.05) টার্মিনেশন চার্জ আরোপের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে নির্ধারিত কিছু নম্বর সিরিজ এই চার্জের বাইরে থাকতে পারে।
TRAI-এর লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্যিক ও স্বয়ংক্রিয় কলের অপব্যবহারের আর্থিক প্রণোদনা কমানো এবং বড় পরিসরে স্প্যাম ছড়ানো কঠিন করে তোলা।
সামনে বড় প্রশ্ন—ব্যবহারকারীর কত তথ্য যাবে?
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের গোপনীয়তা ও প্রতিযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কলার-আইডি অ্যাপগুলোকে ঠিক কতটুকু তথ্য টেলিকম অপারেটরের কাছে দিতে হবে শুধু ব্যবহারকারীর নির্দিষ্ট স্প্যাম রিপোর্ট, নাকি সংশ্লিষ্ট অ্যাপের আরও বিস্তৃত ডেটা ও বিশ্লেষণ সে বিষয়ে বাস্তব প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ব্যবহারকারীকে তথ্য পাঠানোর বিষয়ে কীভাবে জানানো হবে, সম্মতির প্রয়োজন হবে কি না এবং প্রাপ্ত তথ্য কতদিন সংরক্ষণ ও কী কাজে ব্যবহার করা যাবে এসব প্রশ্নও সামনে আসছে।
সব মিলিয়ে ভারতের নতুন নীতিতে স্প্যামবিরোধী লড়াই শুধু টেলিকম নেটওয়ার্কে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কলার-আইডি অ্যাপ, স্বয়ংক্রিয় কলিং ব্যবস্থা এবং এআই-নির্ভর ভয়েস প্রযুক্তিকেও একই নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর বাস্তব প্রয়োগে একদিকে স্প্যাম দমনের সক্ষমতা বাড়তে পারে, অন্যদিকে ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ডেটা ব্যবহারের সীমা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

