শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘সাহস থাকলে ২০০১–০৬ সালের দুর্নীতির তদন্ত করুন’—সরকারকে নাহিদের চ্যালেঞ্জ

দুদককে বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগ • গুম তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন • সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ • মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি

প্রান্তকাল ডেস্ক

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এনসিপি আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এ বক্তব্য দেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, গুমসংক্রান্ত আইন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগকে সামনে রেখে কর্মসূচিটির আয়োজন করা হয়।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, গঠনের সাত মাসের মাথায় দুদক পুনর্গঠনের উদ্যোগের পেছনে এনসিপি ও অন্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করার উদ্দেশ্য রয়েছে। বর্তমান সরকার দুদককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি অতীতের বিএনপি সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান।

মানবাধিকার ও গুম তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

দুদকের প্রসঙ্গের পাশাপাশি সরকারের মানবাধিকার নীতি ও সাম্প্রতিক আইন নিয়েও উদ্বেগ জানান এনসিপির আহ্বায়ক। বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইনি কাঠামো নিয়ে আপত্তির কথা তুলে ধরেন তিনি।

নাহিদের বক্তব্য, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে একই ধরনের বাহিনীর মাধ্যমে সেই অভিযোগ তদন্ত করা হলে তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীর শাস্তির বিধান থাকলে ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বাগেরহাটের জেলে মিরাজ শেখের ঘটনা সামনে আনেন নাহিদ। তার দাবি, পাঁচ মাস ধরে মিরাজের সন্ধান নেই। পরিবার মামলা করতে থানায় গেলেও প্রথমে মামলা নেওয়া হয়নি এবং পরে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করা হলেও সেখানে কোস্ট গার্ডের নাম উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি। এসব দাবি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

‘আপত্তিকর বক্তব্য আর সন্ত্রাস এক বিষয় নয়’

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। এনসিপির সাবেক নেতা গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর ও গাজীপুরের সিফাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সমালোচনা ও আপত্তিকর বক্তব্যের ঘটনায় এ আইনের ব্যবহার মানুষের কথা বলার সুযোগ সংকুচিত করছে।

নাহিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কাউকে নিয়ে কটূক্তি কিংবা আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারের পক্ষে তার দল নয় এবং এ ধরনের ঘটনায় দলীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তবে এমন বক্তব্যকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয় বলে মত দেন তিনি।

হবিগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ছাত্রশক্তির কর্মী আলিফের চোখ হারানোর ঘটনাও বক্তব্যে উল্লেখ করেন নাহিদ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিরোধী দল নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তিনি পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন না করারও সমালোচনা করেন।

তারেক রহমানকে নিয়েও কঠোর সমালোচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকারও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। বিএনপি দীর্ঘ সময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও ক্ষমতায় আসার পর সেই অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী পথে’ অগ্রসর হওয়ার অভিযোগ তুলে নাহিদ বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে জনগণ রাজপথে তার বিরোধিতা করবে। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় নাগরিকদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিলের দাবি

মানববন্ধনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, নতুন আইনি কাঠামোয় ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে।

তিনি বর্তমান আইন বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ পুনর্বহালের দাবি জানান। পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন, গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনের পরিবর্তন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে—এমন বিধান না রাখার দাবি তোলেন।

‘পুরোনো কাঠামো নতুন মোড়কে ফিরছে’

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন, সংস্কার কমিশনসহ বিভিন্ন পক্ষের সুপারিশ থাকার পরও আইনের ফাঁক ব্যবহার করে পুরোনো ব্যবস্থার অনেক কিছু নতুন কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার এবং তদন্তকারী সংস্থার জবাবদিহি আইনে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ এবং দায়ীদের জবাবদিহির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

মানববন্ধনে এনসিপির পাশাপাশি দলটির যুবশক্তি ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরাও অংশ নেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন