শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদি আরবকে ৪৮টি এফ-৩৫ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত

সম্ভাব্য চুক্তির মূল্য ২৪.৩ বিলিয়ন ডলার • কংগ্রেসের অনুমোদন এখনো বাকি • প্যাকেজে ৪৯টি ইঞ্জিন ও সহায়ক সরঞ্জাম • চীনের হাতে প্রযুক্তি পৌঁছানোর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ • মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ভারসাম্যের প্রশ্নও আলোচনায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান বিক্রির পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রিয়াদের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ লাইটনিং–২ যুদ্ধবিমান ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বিক্রির সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ অনুমোদন করেছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সম্ভাব্য এই সামরিক বিক্রিতে অনুমোদন দেয়। প্রস্তাবিত প্যাকেজে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি ইঞ্জিন, যোগাযোগব্যবস্থা, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য সহায়ক সরঞ্জাম থাকবে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত বিক্রয় নয়; মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে এফ-৩৫-এর নতুন অধ্যায়

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-৩৫ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। অত্যাধুনিক সেন্সর, স্টেলথ প্রযুক্তি ও বহুমুখী যুদ্ধক্ষমতার কারণে এটি মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি।

প্রস্তাবিত বিক্রি সম্পন্ন হলে সৌদি বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই এফ-৩৫ পরিচালনাকারী দেশ। ফলে সৌদি আরবকে একই যুদ্ধবিমান দেওয়ার সম্ভাবনা আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য এবং ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ‘গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ বজায় রাখার মার্কিন নীতি নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য বলেছে, প্রস্তাবিত বিক্রিটি অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনবে না। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে।

হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেই সিদ্ধান্ত

এই অনুমোদন এমন সময়ে এলো, যখন ইয়েমেনের ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতি বাহিনীর সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনা বেড়েছে।

সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের তৎপরতা মোকাবিলায় রিয়াদ ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহায়তাও চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলায় অংশ না নিলেও গোয়েন্দা তথ্য ও টার্গেটিং সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে এফ-৩৫ বিক্রির সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছে ট্রাম্প প্রশাসন।

উদ্বেগের কেন্দ্রে চীন

তবে এই সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রি নিয়ে ওয়াশিংটনের ভেতরেও আপত্তি রয়েছে। এর অন্যতম কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক।

মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একাংশের আশঙ্কা, সৌদি আরবে এফ-৩৫ মোতায়েন হলে অত্যন্ত সংবেদনশীল মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি সম্পর্কে চীন তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পেতে পারে।

ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ও প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তি এই ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সম্ভাব্য বিক্রির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন গোয়েন্দা মহল যখন সংবেদনশীল প্রযুক্তি চীনের নাগালে চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছে, তখন এ ধরনের বিক্রি নিয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন

সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার আরেকটি স্পর্শকাতর দিক হচ্ছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ‘Qualitative Military Edge’ বা গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। এ কারণে অঞ্চলের অন্য দেশকে উন্নত মার্কিন অস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা হয়।

সৌদি আরব বহু বছর ধরে এফ-৩৫ কেনার আগ্রহ জানালেও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অতীতে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, প্রস্তাবিত বিক্রি আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য নষ্ট করবে না।

কংগ্রেসে আসছে পরীক্ষা

পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুমোদন মানেই এখনই যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি আরবের হাতে চলে যাচ্ছে না। সম্ভাব্য বিক্রিটি কংগ্রেসের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং আইনপ্রণেতারা চাইলে আপত্তি তোলার সুযোগ পাবেন।

সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি, চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান—এই তিনটি বিষয় কংগ্রেসের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

রিয়াদ-ওয়াশিংটন প্রতিরক্ষা সম্পর্কে নতুন মাত্রা

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় অস্ত্র ক্রেতা। এফ-৩৫ বিক্রি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের কয়েক দশকের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়।

তবে প্রস্তাবিত চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা এবং এফ-৩৫-এর সংবেদনশীল প্রযুক্তি সুরক্ষায় ওয়াশিংটন কী ধরনের শর্ত আরোপ করে তার ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন