অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জলবায়ু সংকটের সমাধান খুঁজছেন তরুণেরা, কিন্তু উদ্ভাবন কি পৌঁছাবে বাজারে?

বর্জ্য থেকে সম্পদ, সূর্যের শক্তিতে শীতলীকরণ, গেমিফিকেশনে রিসাইক্লিং- বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে তরুণদের চমক • অর্থায়ন ও বাজারসংযোগই বড় বাধা • নীতিনির্ধারক-বিনিয়োগকারীদের সামনে Eco Leaders-এর উদ্ভাবন • প্রদর্শনী শেষে উদ্যোগগুলো কোথায় দাঁড়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন

প্রান্তকাল বিশেষ প্রতিবেদন

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিদেশি প্রযুক্তি বা ভবিষ্যতের কোনো বড় প্রকল্পের জন্য অপেক্ষা করছেন না বাংলাদেশের তরুণেরা। কেউ চা ও আখের বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার পথ খুঁজছেন, কেউ সূর্যের শক্তি ব্যবহার করে তৈরি করছেন শীতলীকরণ সমাধান, আবার কেউ গেমিফিকেশনের মাধ্যমে মানুষকে রিসাইক্লিংয়ে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর এসব উদ্ভাবনের কী হবে?

বাংলাদেশে উদ্ভাবনী ধারণার অভাব নেই। সংকটটি বরং অন্য জায়গায়—গবেষণা বা প্রোটোটাইপ থেকে একটি উদ্ভাবনকে বাজারযোগ্য পণ্যে পরিণত করার অর্থ, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা কতটা রয়েছে?

১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নভো থিয়েটারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬ সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

মেলায় Eco Leaders কর্মসূচির আওতায় The Earth-এর সঙ্গে যুক্ত তরুণ জলবায়ু উদ্ভাবকেরাও তাদের সমাধান তুলে ধরেছেন। তাদের লক্ষ্য শুধু পরিবেশ রক্ষার বার্তা দেওয়া নয়; বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য সমাধান দাঁড় করানো।

বর্জ্য যেখানে কাঁচামাল

তরুণদের কয়েকটি উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে সার্কুলার ইকোনমি। চা ও আখ প্রক্রিয়াজাতকরণের পর ফেলে দেওয়া উপকরণকে নতুন মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের চেষ্টা তার উদাহরণ।

প্রচলিত ব্যবস্থায় যে জিনিস বর্জ্য, নতুন ব্যবসায়িক মডেলে সেটিই হতে পারে কাঁচামাল। ফলে একই উদ্যোগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং নতুন অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

আরেক দল কাজ করছেন সৌরশক্তিনির্ভর কুলিং সল্যুশন নিয়ে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতার বাস্তবতায় এ ধরনের প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে।

অন্যদিকে রিসাইক্লিংকে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে প্রযুক্তি ও গেমিফিকেশন ব্যবহারের ধারণাও সামনে এসেছে। পয়েন্ট, অর্জন কিংবা পুরস্কারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষ করে তরুণদের বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারে যুক্ত করার চেষ্টা রয়েছে এতে।

এক হাজার উদ্ভাবন, তারপর?

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবারের ইনোভেশন ফেয়ারে প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতে এক হাজারের বেশি নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন প্রদর্শিত হয়েছে। অংশ নিয়েছে ৭৩টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, স্টার্টআপ, এসএমই এবং বিনিয়োগকারী।

ফেয়ারের মূল দর্শন—‘Innovate to Market’।

অর্থাৎ উদ্ভাবন শুধু স্টল, গবেষণাগার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পে আটকে থাকবে না; বাজারে যাবে, ব্যবসায় পরিণত হবে এবং অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করবে।

কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের উদ্ভাবন ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাটি স্পষ্ট।

মেলার আগেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, শুধু উদ্ভাবন করাই যথেষ্ট নয়। উদ্ভাবকদের অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা, শিল্পখাতের অংশীদারত্ব, মেধাস্বত্বের সুরক্ষা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থাৎ সরকারও কার্যত স্বীকার করছে—আইডিয়া আছে, কিন্তু আইডিয়া থেকে বাজারে যাওয়ার সেতুটি এখনো যথেষ্ট শক্ত নয়।

গবেষণায় বিনিয়োগেও বড় ঘাটতি

সমস্যাটি আরও গভীরে।

বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারের উদ্বোধনী প্লেনারির তথ্যেই বলা হয়েছে, দেশে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) ব্যয় এখনো মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের নিচে। অথচ পূর্ব এশিয়ার অনেক অর্থনীতি উন্নয়নের তুলনামূলক পর্যায়ে গবেষণায় জিডিপির ২ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করেছে।

এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু তরুণদের উদ্ভাবনের আহ্বান জানালেই একটি উদ্ভাবনী অর্থনীতি তৈরি হয় না। প্রয়োজন গবেষণার অর্থ, পরীক্ষাগার, প্রোটোটাইপ তৈরির সুবিধা, পেটেন্ট সুরক্ষা, বিনিয়োগকারী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—বাজার।

Eco Leaders: প্রশিক্ষণ থেকে মাঠে

The Earth-এর Eco Leaders কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, নেতৃত্ব ও নীতি-অ্যাডভোকেসিতে তরুণদের প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপ দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আগের পর্যায়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের বিশেষভাবে যুক্ত করা এবং নির্বাচিত প্রকল্পে ছোট আকারের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

এবারের Climate Innovation Fair-এ সীমিতসংখ্যক তরুণ দলকে জলবায়ু সমাধানভিত্তিক পণ্য, প্রোটোটাইপ ও সেবা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়। আয়োজকদের ঘোষণায় বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের সামনে উদ্ভাবন উপস্থাপনের সুযোগও রাখা হয়েছিল।

এখানেই উদ্যোগটির গুরুত্ব—একজন তরুণ উদ্ভাবককে শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়, তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও সম্ভাব্য অর্থায়নকারীর সামনে নিয়ে যাওয়া।

প্রদর্শনী নয়, প্রয়োজন বিনিয়োগ

বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশীয় উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর এবং উদ্ভাবকদের সরাসরি বাজার ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ফেয়ার শেষ হয়েছে। আলো নিভেছে স্টলের। দর্শনার্থীরাও ফিরে গেছেন।

এখন আসল পরীক্ষা শুরু।

চা ও আখের বর্জ্য থেকে তৈরি সমাধানটি কি কারখানায় পৌঁছাবে? সৌরশক্তিনির্ভর কুলিং প্রযুক্তি কি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার সুযোগ পাবে? গেমিফিকেশনভিত্তিক রিসাইক্লিং ধারণাটি কি কোনো শহর বা প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়িত হবে?

বাংলাদেশের তরুণেরা প্রমাণ করছেন, তাদের আইডিয়ার ঘাটতি নেই। এখন প্রমাণ করতে হবে রাষ্ট্র, শিল্পখাত ও বিনিয়োগকারীরা সেই আইডিয়াকে বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কতটা প্রস্তুত।

কারণ জলবায়ু সংকট ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। আর তরুণদের উদ্ভাবনও শুধু ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হয়ে থাকলে চলবে না—সেগুলোকে এখনই বাস্তব সমাধানে পরিণত করতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন