শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বে ট্রাম্পের নতুন আদেশ আপাতত বহাল, নিষেধাজ্ঞা দিলেন না বিচারক

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশ ঠেকানোর চেষ্টা আপাতত সফল হয়নি। আদেশটির ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এক ফেডারেল বিচারক। তবে এতে ট্রাম্পের আদেশ বৈধ বলে স্বীকৃতি পায়নি; বরং মামলাকারীদের আবেদন সংশোধন করে আবার আদালতে আসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্বের অধিকার সীমিত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশ ঘিরে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। শুক্রবার ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক ডেবোরাহ বোর্ডম্যান আদেশটির কার্যকারিতা তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করার আবেদন মঞ্জুর করেননি।

তবে ট্রাম্পের নতুন পদক্ষেপ নিয়ে নিজের উদ্বেগও গোপন করেননি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নিয়োগ দেওয়া এই বিচারক। নতুন নির্বাহী আদেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, তার জানা মতে এমন পদক্ষেপ নজিরবিহীন।

আদালতের সিদ্ধান্তে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো সাময়িক ধাক্কা খেলেও আইনি লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। বিচারক মামলাকারীদের গত ৬ আগস্ট জারি করা নতুন নির্বাহী আদেশটি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করে অভিযোগ সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। সংশোধিত আবেদন জমা পড়ার পর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আবারও বিবেচনা করা হতে পারে।

ট্রাম্পের লক্ষ্য কী?

দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন ট্রাম্প। এর অন্যতম বিতর্কিত অংশ জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার চেষ্টা।

ট্রাম্প ও তার মিত্রদের অভিযোগ, বর্তমান ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বিদেশি নাগরিকদের কেউ কেউ শুধু সন্তানের মার্কিন নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেন—যাকে তারা ‘বার্থ ট্যুরিজম’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করে নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন ট্রাম্প। সেখানে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী অথবা বৈধভাবে সাময়িক সময়ের জন্য থাকা নির্দিষ্ট শ্রেণির অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্বের নথি না দেওয়ার নির্দেশনা ছিল।

আদেশটি জারির পরপরই আদালতে একের পর এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিচারক বোর্ডম্যানও সে সময় প্রথম আদেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বিচারকদের একজন ছিলেন।

এরপর এলো দ্বিতীয় আদেশ

আগের উদ্যোগ আইনি বাধার মুখে পড়ার পর গত ৬ আগস্ট নতুন করে নির্বাহী আদেশ জারি করেন ট্রাম্প। এবার আগের তুলনায় এর পরিধি সংকুচিত করা হয়।

নতুন আদেশে নির্দিষ্ট কিছু অনাগরিক বাবা-মায়ের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এলিয়েন এনিমি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের সন্তান এবং কেবল সন্তানের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে এসে সন্তান জন্ম দেওয়ার কিছু ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ব্যবস্থাকে বিদেশি পক্ষের অপব্যবহার থেকে রক্ষা করতেই এ উদ্যোগ।

কী বলে মার্কিন সংবিধান?

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী।

১৮৬৮ সালে গৃহীত সংশোধনীটি যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির আইনি এখতিয়ারের আওতাধীন ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করে। এর ফলে সাধারণভাবে বাবা-মায়ের জাতীয়তা বা অভিবাসন অবস্থান যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশু মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কূটনীতিকদের সন্তানসহ অল্প কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে।

এই নীতির পক্ষে দীর্ঘদিনের বিচারিক নজিরও রয়েছে। United States v. Wong Kim Ark মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট চীনা অভিবাসী বাবা-মায়ের ঘরে সান ফ্রান্সিসকোতে জন্ম নেওয়া এক ব্যক্তির মার্কিন নাগরিকত্ব অস্বীকার করা যাবে না বলে রায় দিয়েছিল।

‘প্রেসিডেন্ট ঠিক করতে পারেন না কে জন্মসূত্রে নাগরিক’

ট্রাম্পের নতুন আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে গেছে অভিবাসী পরিবার ও অধিকার সংগঠনগুলোর একটি জোট। এর মধ্যে রয়েছে We Are CASA ও Asylum Seeker Advocacy Project।

তাদের মূল বক্তব্য, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সংবিধান স্বীকৃত অধিকার হওয়ায় নির্বাহী আদেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট নিজের মতো করে নির্ধারণ করতে পারেন না কে মার্কিন নাগরিক হবে আর কে হবে না।

তাদের দাবি, প্রেসিডেন্ট যতবারই নতুন নির্বাহী আদেশ জারি করুন না কেন, নির্বাহী বিভাগ সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকত্ব অস্বীকার করতে পারে না।

লড়াই এখনো শেষ নয়

শুক্রবারের আদালতের সিদ্ধান্ত তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি হলেও এটি বড় কোনো চূড়ান্ত আইনি বিজয় নয়। বিচারক নতুন নির্বাহী আদেশ সাংবিধানিক কি না, সেই মূল প্রশ্নে এখনো রায় দেননি।

অন্যদিকে অধিকার সংগঠনগুলোর জন্যও পথ বন্ধ হয়নি। তাদের এখন নতুন নির্বাহী আদেশের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধিত অভিযোগ জমা দিতে হবে। এরপর আদালত আদেশটির বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন নতুন করে বিবেচনা করতে পারেন।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কে জন্মসূত্রে নাগরিক হবেন—দেড় শতাব্দীর বেশি পুরোনো সেই সাংবিধানিক প্রশ্নকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আইনি লড়াই এখন নতুন পর্বে প্রবেশ করল।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন