অনুসরণ করুন:
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

গাজায় ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যয়, পানিতে তলিয়ে গেছে হাজারো তাঁবু

ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে বিপর্যস্ত শরণার্থী শিবির, শীতের আগে আশ্রয় সংকটে নারী-শিশুরা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় শীতের আগেই ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও শহরের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার অস্থায়ী তাঁবু। ভিজে গেছে বিছানা, কম্বল ও পরনের কাপড়। তীব্র ঠান্ডা ও বাতাসে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন নারী ও শিশুরা।

হামাস পরিচালিত গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস শনিবার (৭ নভেম্বর) জানিয়েছে, গত ১২ ঘণ্টায় অন্তত ৭০ হাজার তাঁবু বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এমন নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে উত্তর গাজায় ইসরাইলি গোলাবর্ষণে আগে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের দেয়াল ধসে দুই ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের কাছ থেকে তারা ১ হাজার ৫০০টি জরুরি সহায়তার ফোন পেয়েছে। এ ছাড়া পরিত্যক্ত তিনটি বাড়ি ধসে পড়েছে। তবে এসব ঘটনায় কেউ আহত হননি।

তাঁবু থেকে পানি সরাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাসিন্দারা

গাজা শহরের একটি তাঁবু শিবিরে কেউ তাঁবু মেরামতের চেষ্টা করছেন, কেউ বালু দিয়ে তাঁবুর চারপাশ শক্ত করে পানি প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া তাঁবু থেকে সন্তানদের বের করে আনছেন।

গাজার বাসিন্দা ওলফাত মাগদুব নিজের তাঁবু থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির প্রথম দিনেই আমাদের তাঁবু পানিতে ডুবে গেছে। পরদিন আবার বৃষ্টি হলে কী হবে? মাত্র প্রথম দিনেই আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে যখন বৃষ্টি হয়েছিল, আল্লাহর কসম, চার দিন মেঝেতে কম্বল পেতে ঘুমিয়েছি। কারণ বৃষ্টির পানিতে বিছানাপত্র ভিজে গিয়েছিল। এবারও একই অবস্থা। তোশক ভিজে যাওয়ায় মেঝেতেই ঘুমাতে হচ্ছে।’

পৌরসভা ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট ও সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির কারণে ঝড়ের পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না তারা।

তাদের ভাষ্য, হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরাইল শত শত যানবাহন ধ্বংস করেছে। এসবের মধ্যে বুলডোজার ও পানি নিষ্কাশনে ব্যবহৃত যানবাহনও রয়েছে। যুদ্ধে গাজার ২০ লাখের বেশি বাসিন্দার অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ভূখণ্ডটির বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ তাঁবুর শিবিরে বসবাস করছেন।

গাজায় আশ্রয়কেন্দ্র ও নির্মাণসামগ্রী প্রবেশ করতে না দেওয়ার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছে হামাস। তবে হামাসের অভিযোগের বিষয়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ত্রাণ সমন্বয়কারী সংস্থা কোগাট তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের পর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে গাজাজুড়ে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ উন্নয়নে তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।

পানিতে তলিয়ে গেছে আল-মিনা শিবির

গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও শহর প্লাবিত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইল গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালানো বহু ফিলিস্তিনি এবার চতুর্থ শীতও কাটাচ্ছেন অস্থায়ী আশ্রয়ে।

শনিবারের বৃষ্টিতে গাজার কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে পানির উচ্চতা ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার কাছে শত শত ফোন এসেছে।

আল-মিনা শিবিরে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি পরিবারের বসবাস। বৃষ্টির পানিতে সেখানকার অসংখ্য তাঁবু ডুবে গেছে। পুরো শিবিরের মাটি কাদামিশ্রিত পানিতে পরিণত হয়েছে।

৪০ বছর বয়সি রায়েদ আবু আমশা জানান, ঝড়ের সময় তার পরিবারের ওপর তাঁবুটি ভেঙে পড়ে। তার দায়িত্বে থাকা নয় শিশুর সবার কাপড় ও কম্বল ভিজে গেছে। এদের মধ্যে চারজন তার প্রয়াত ভাইয়ের সন্তান।

তিনি বলেন, ‘নিজের সন্তানদের পাশাপাশি এতিম শিশুদেরও দায়িত্ব আমার ওপর। কিন্তু তাদের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য আমার নেই। মাত্র দুই ঘণ্টার ঝড়ে আমাদের এই অবস্থা হয়েছে। আমাদের তাঁবু, ত্রিপল এবং সন্তানদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু দরকার। আর কত দিন এভাবে থাকতে হবে?’

ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনেও বাড়ছে ঝুঁকি

মধ্য গাজার কয়েক দশক পুরোনো নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরেও বৃষ্টিতে দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। সেখানে স্থায়ী ভবন থাকলেও ইসরাইলি বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরগুলো এখন বৃষ্টির পানিতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

৫৪ বছর বয়সি নাসের আল-হাজ্জ থাকেন একটি বহুতল ভবনে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলি হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওপরের তলাগুলো থেকে ধ্বংসাবশেষ তার ঘরের ওপর পড়ে ছাদে বড় একটি গর্ত তৈরি করেছে। বৃষ্টি হলেই সেই গর্ত দিয়ে ঘরে পানি ঢোকে।

ছাদটি সাপোর্ট বিম দিয়ে মেরামত করা হলেও একজন প্রকৌশলী নাসেরকে সতর্ক করেছেন, ভবনটি এখনো বিপজ্জনক। গাজায় আরও খারাপ আবহাওয়া দেখা দিলে ভবনটির ধ্বংসাবশেষ ভেঙে পড়তে পারে।

সর্বশেষ ঝড়ের সময় সন্তানদের নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেন নাসের। ছাদ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়া বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করেন। তার দুই সন্তান অটিজমে আক্রান্ত। তারা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে দূরে ভবনটির নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষে ঘুমায়।

আলজাজিরাকে নাসের বলেন, ‘আমি এমন একটি জায়গায় থাকতে বাধ্য হচ্ছি, যেটি যেকোনো মুহূর্তে আমাদের মাথার ওপর ধসে পড়তে পারে। কিন্তু আমি কোথায় যাব? বাড়িভাড়া অনেক বেশি, আবার তাঁবুও নিরাপদ নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানি জায়গাটি কতটা বিপজ্জনক। কিন্তু আমার আর কোনো বিকল্প নেই।’

বন্যার ঝুঁকিতে ৯ লাখ ৫০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গাজায় প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বসবাস করছেন। নিচু এলাকা ও উপকূলসংলগ্ন স্থানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

এর মধ্যে ৪ লাখের বেশি মানুষ এমন এলাকায় রয়েছেন, যেগুলোকে বন্যার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ৪৪ হাজার ফিলিস্তিনি কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। ইসরাইলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাজার ৪ হাজারের বেশি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শীতের আগে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৫০টি পরিবারের আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে যে পরিমাণ সরঞ্জাম রয়েছে, তা দিয়ে তাদের চাহিদার মাত্র ১৮ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব।

বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও অকার্যকর

ঝড় ও বৃষ্টির পানি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে গাজা পৌরসভাও। পৌর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন লাইন এবং ২১২ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আটটি পাম্পিং স্টেশন ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহের তিনটি প্রধান জলাধারও অচল হয়ে পড়েছে।

পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না জানান, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও অবশিষ্ট নিষ্কাশন ব্যবস্থা দিয়ে মোট বৃষ্টির পানির মাত্র ২০ শতাংশ সামাল দেওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে আমরা নিষ্কাশন ব্যবস্থাগুলো পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

সেই লক্ষ্যে পৌরসভার কর্মীরা নালা ও ম্যানহোল পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ, পানিপ্রবাহের পথ সচল রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশন লাইন মেরামত এবং পানির পাম্প চালু রাখার কাজ করছেন।

তবে জ্বালানি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটের কারণে এসব উদ্যোগে নিষ্কাশন ব্যবস্থার আগের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে সতর্ক করেছেন মুহান্না।

তিনি আরও জানান, শুধু গাজা শহরেই ২ হাজারের বেশি ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শহরটিতে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ ২ কোটি ৫০ লাখ টন ছাড়িয়েছে।

তাঁবু ও ত্রিপলের সংকট

শরণার্থী শিবিরগুলোতে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনাকারী কমিটিগুলোও আশ্রয় উপকরণের সংকটে পড়েছে।

নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের জরুরি কমিটির কর্মকর্তা আদলি আওয়াদ জানান, বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে তাঁবু ও ত্রিপল বিতরণের চেষ্টা করছেন তারা। তবে সহায়তার প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা মজুত সরঞ্জামের তুলনায় অনেক বেশি।

তিনি বলেন, ‘আমরা যত বেশি সম্ভব তাঁবু ও ত্রিপল সরবরাহের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি তাঁবু থেকে বৃষ্টির পানি সরিয়ে নিতে এবং জলাবদ্ধতা কমাতে পরিবারগুলোকে পানি নিষ্কাশনের নালা খননেও সহায়তা করছি।’


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন