তিতাস শেখের বাড়িতে গিয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান, দালাল চক্র গ্রেপ্তারে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ
যেকোনো মূল্যে মানব পাচারকারীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। দেশে ও দেশের বাইরে সক্রিয় মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের গ্রেপ্তারে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
টেকনাফে মানব পাচারকারীদের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের বাড়িতে গিয়ে এসব নির্দেশনা দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে নিহত তিতাস শেখের বাড়িতে যান তিনি। এ সময় শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানান। পরে তিতাসের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া করা হয়।
মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক যুদ্ধের আহ্বান
এ সময় শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, তিতাস শেখ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন চৌকস ও সাহসী সৈনিক ছিলেন। মানব পাচারকারীদের গুলিতে তাকে হারাতে হয়েছে। এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে যুদ্ধ শুরু করতে হবে। যেকোনো মূল্যে তাদের প্রতিহত করতে হবে। কারণ, তারা দেশের ও জনগণের শত্রু।
পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে তৎপরতা
মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পাচারকারীদের শনাক্ত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট শুধু একটি এলাকায় নয়, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয়।
বাংলাদেশ থেকে যেসব রুটে সাধারণ মানুষকে পাচারের চেষ্টা করা হয়, সেসব রুটের সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার, পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। কীভাবে পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে কঠোরতম সাজা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে।
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরসহ ১৪টি জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে মানব পাচারবিষয়ক সভা হয়েছে। সেখানে ওয়ার্ড থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দালাল চক্রের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ডিসি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে কাজ করতে বলা হয়েছে। বিদেশে নিখোঁজ, জিম্মি বা আটক ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতেও পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
মানব পাচার দমনে সরকারের পদক্ষেপ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ লর্ড ও মাফিয়াদের দেখা গেছে, যারা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমান সরকার মানব পাচারকারীদের দমনে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করছে। মানব পাচারকারী চক্র শুধু দেশে নয়, বিদেশেও সক্রিয়। দেশে ও বিদেশে সব জায়গাতেই সরকার সোচ্চার রয়েছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, মানব পাচারকারীদের কারণে তিতাসের মতো সাহসী সৈনিকেরা শহীদ হচ্ছেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষও নিরাপদে বিদেশে যেতে পারছেন না। এ কারণে মানব পাচারকারীদের প্রতিহত করতে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আযাদ, নিহতের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
টেকনাফে অভিযানে নিহত হন সেনাসদস্য তিতাস
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফের গহিন পাহাড়ে অভিযান চালানোর সময় মানব পাচারকারীদের গুলিতে নিহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৮)। তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো।
২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। পরে লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নানির পাশের কবরে তাকে দাফন করা হয়।

