রবি মৌসুমে সরিষা, চিনাবাদাম, সয়াবিন, মুগ, মসুর, খেসারি ও অড়হর চাষে সহায়তা; কৃষি মন্ত্রণালয়ের জিও জারি, উপকারভোগী নির্বাচনে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার
২০২৬-২৭ অর্থবছরে রবি মৌসুমে সাতটি ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে দেশজুড়ে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় সরিষা, চিনাবাদাম, সয়াবিন, মুগ, মসুর, খেসারি ও অড়হর চাষের জন্য কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার দেওয়া হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচিতে ১৪ লাখ ৬০ হাজার কৃষককে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯৮ কোটি ৮৯ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ২ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত সরকারি আদেশ (জিও) জারি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের উপকরণ-২ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ সুহেল মাহমুদ স্বাক্ষরিত আদেশে অর্থ বরাদ্দ, উপকারভোগী নির্বাচন, বীজ ও সার বিতরণ এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরিষা চাষে সবচেয়ে বেশি কৃষককে সহায়তা
সাতটি ফসলের মধ্যে সরিষা চাষে সবচেয়ে বেশি কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হবে। এ খাতে ১২ লাখ ৯০ হাজার কৃষকের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ কোটি ৪২ লাখ ২৪ হাজার টাকা।
এ ছাড়া চিনাবাদাম চাষে ৩৫ হাজার কৃষকের জন্য ৩ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা, সয়াবিনে ৩০ হাজার কৃষকের জন্য ৯৮ লাখ টাকা, মুগে ৩০ হাজার কৃষকের জন্য ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং মসুর চাষে ২০ হাজার কৃষকের জন্য ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
খেসারি চাষে ২০ হাজার কৃষকের জন্য ৩ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং অড়হর চাষে পাঁচ হাজার কৃষকের জন্য ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
এক পরিবার পাবে একটি ফসলের জন্য সহায়তা
সরকারি আদেশ অনুযায়ী, কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাত থেকে এ কর্মসূচির অর্থ ব্যয় করা হবে। জেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি বরাদ্দ অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ে অর্থ বণ্টন করবে। এরপর উপজেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক নির্বাচন করে উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করবে।
একটি কৃষক পরিবার সাতটি ফসলের মধ্যে যেকোনো একটির জন্য এ প্রণোদনা পাবে। একই পরিবারকে একাধিক ফসলের জন্য সহায়তা দেওয়া যাবে না।
এক বিঘা জমিতে চাষের জন্য নির্বাচিত কৃষককে ফসলভেদে নির্ধারিত পরিমাণ বীজ দেওয়া হবে। এর মধ্যে সরিষার এক কেজি, চিনাবাদামের ১০ কেজি, সয়াবিনের চার কেজি, মুগের দুই কেজি, মসুরের তিন কেজি, খেসারির আট কেজি এবং অড়হরের দুই কেজি বীজ রয়েছে।
ফসলভেদে সার বরাদ্দ
বীজের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ফসল অনুযায়ী ডিএপি ও এমওপি সার বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১০ জন কৃষককে নিয়ে একটি পুল গঠন করে তাঁদের মধ্যে সার বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরিষা ও সয়াবিন চাষের ক্ষেত্রে ১০ জনের একটি পুলের জন্য ১০ কেজির এক বস্তা ডিএপি এবং ১০ কেজির এক বস্তা এমওপি সার দেওয়া হবে।
অন্যদিকে চিনাবাদাম, মুগ, মসুর ও খেসারি চাষের জন্য ১০ জনের একটি পুলে ২০ কেজির দুই বস্তা ডিএপি এবং ১০ কেজির এক বস্তা এমওপি সার বরাদ্দ থাকবে। অড়হর চাষের ক্ষেত্রেও একই পরিমাণ সার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
১০ বিঘা জমিতে ব্লকভিত্তিক কার্যক্রম
কর্মসূচির আওতায় ১০ জন কৃষককে নিয়ে একটি পুল গঠনের পাশাপাশি পাশাপাশি অন্তত ১০ বিঘা জমিতে ব্লকভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। কৃষক নির্বাচন ও উপকরণ বিতরণের ক্ষেত্রে যেসব এলাকায় নতুন করে আবাদ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
উপকরণ বিতরণের সময় কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন নম্বর সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষি কার্ডে সহায়তার বিবরণ লিখে রাখতে হবে এবং বীজ ও সার গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে কৃষকের স্বাক্ষর অথবা টিপসই নিতে হবে।
আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত কৃষক ছাড়া অন্য কাউকে এসব উপকরণ দেওয়া যাবে না। উপকারভোগী কৃষককে নিজে উপস্থিত হয়ে উপকরণ গ্রহণ করতে হবে।
তালিকা প্রকাশ ও বাস্তবায়ন তদারকির নির্দেশনা
প্রণোদনার আওতায় নির্বাচিত কৃষকদের তালিকা জেলা ও উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। উপকরণ বিতরণ শেষ হওয়ার ১০ কর্মদিবসের মধ্যে এবং ফসল কর্তন শেষ হওয়ার ১০ কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচির অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬ (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা ২০২৫ (পিপিআর) অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত আর্থিক বিধিবিধান মেনে বরাদ্দের মধ্যেই ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। বরাদ্দের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
অর্থ ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব এবং অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার চালানের অনুলিপি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এ কর্মসূচিতে অগ্রিম উত্তোলিত অর্থ আগামী ৩০ জুন ২০২৭-এর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।
এ ছাড়া বিতরণ করা বীজ ও সারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, উপকরণ বিতরণ ও অর্থ ব্যয়ের পুরো প্রক্রিয়া নিয়মিত পরিবীক্ষণ এবং চলমান অন্য পুনর্বাসন কর্মসূচির সঙ্গে যাতে একই কৃষক বা একই কার্যক্রমে দ্বৈত সহায়তা না হয়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

