নিষিদ্ধ সামুদ্রিক এলাকায় চলাচলের সময় ট্যাংকারটি মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে দাবি তেহরানের। একই দিনে কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংসের কথা জানিয়েছে ইরান।
হরমুজ প্রণালির পূর্ব দিকে সমুদ্রে পেতে রাখা মাইনের আঘাতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে গেছে। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ইরানের নৌবাহিনী। অন্যদিকে, কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মাইনের আঘাতে ট্যাংকারে আগুন
এক বিবৃতিতে ইরানের নৌবাহিনী জানায়, নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষিত একটি সামুদ্রিক এলাকায় চলাচলের সময় ট্যাংকারটি মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও জাহাজটি ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। এ সময় জাহাজটির নেভিগেশন ব্যবস্থাও বন্ধ রাখা হয়েছিল।
মাইনের আঘাতে আগুন ধরে যাওয়ার পর জাহাজটি চলাচলের সক্ষমতা হারায়।
ইরানের নৌবাহিনী সতর্ক করে বলেছে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে চলাচলকারী সব জাহাজের পরিণতি একই হবে।
এর আগে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানায়, অনুমতি ছাড়া নিষিদ্ধ জলসীমায় প্রবেশ করায় হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়।
আইআরজিসির দাবি, ইরানের আরোপিত সামুদ্রিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে জাহাজ দুটি অননুমোদিত পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি ত্যাগের চেষ্টা করছিল। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় চলাচলকারী জাহাজ দুটি তাদের নেভিগেশন ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল।
ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তেহরানের ঘোষিত অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার না করার সতর্কতা দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে ইরানের সামুদ্রিক সমন্বয়সংক্রান্ত নির্দেশনা উপেক্ষা করে চলাচল না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধ
পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট এটি। সমুদ্রপথে বিশ্বে সরবরাহ করা মোট তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে ইরান। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এ পদক্ষেপের পর বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে তেল ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়াশিংটন ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) কয়েক দফায় কৌশলগত তেলের মজুত বাজারে ছাড়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে ওই সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ তেহরানের।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আবারও গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ করে দেয়।
কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলা
এর আগে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ইরানের কেশম দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে এ হামলার কথা নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘অনেক অগ্রগতি’ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সীমিত আকারে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
তিনি বলেন, ‘তারা একটি ছোট আকারের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। আমরা সেটি প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে, হয়তো পাঁচ মিনিটেই ধ্বংস করে দিয়েছি।’
এর কিছুক্ষণ আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
এর মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দেশটির সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ ড্রোন প্রতিহত করে ধ্বংস করেছে।
কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবরের প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, সেখানকার পরিস্থিতি ‘তুলনামূলক শান্ত’ রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির দাবি ট্রাম্পের
শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কয়েকবার ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানান ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমরা অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছি।’ তবে আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রকাশিত খবর নাকচ করেছে কাতার।
শনিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার মতো মিথ্যা তথ্য প্রচার কেবল তাদেরই সুবিধা দিচ্ছে, যারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে এবং অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে চায়।
এর আগে শুক্রবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক উন্মুক্ত আলোচনায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা এড়াতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সংকটটি অমীমাংসিত অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উত্তেজনা কমানোর উপায় খুঁজতে আমরা মার্কিন প্রশাসনের এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করেছি, যাদের এ বিষয়ে আন্তরিক সদিচ্ছা রয়েছে।’
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তেহরানের কয়েকজন বিচক্ষণ ব্যক্তির ভূমিকার কারণেও পরিস্থিতি আরও বড় আকার ধারণ করা থেকে ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর প্রথম হামলা
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর শুক্রবারের হামলাই ছিল ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম মার্কিন সামরিক হামলা।
নির্বাচনের একদিন আগে সোমবার (২ নভেম্বর) ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে। একই সময়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের ভরাডুবি হয়েছে। এর জন্য ইরান যুদ্ধ দায়ী বলে স্বীকার করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে নির্বাচনের পর থেকে ইরানকে নিয়ে কখনো কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো যুদ্ধের সমাধান কাছাকাছি বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ট্রাম্প বলেন, ইরানের বাকি অংশ ‘ধ্বংস’ করে দিতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে। তিনি আরও বলেন, তিনি এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন কি না, তা ‘খুব শিগগিরই’ জানা যাবে।
এর আগে বুধবার (৪ নভেম্বর) নিউইয়র্ক টাইমসকে পেন্টাগনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা জানান, ট্রাম্পের নির্দেশ পেলে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন বাহিনী।
মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটি এবং এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজে হাজার হাজার মার্কিন বিমান ও নৌসেনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানান তারা।
অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলা আবারও শুরু হতে পারে বলে ট্রাম্পের ইঙ্গিতের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে তেহরান।

