অনুসরণ করুন:
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

যুবসমাজকে কর্মমুখী করতে হবে, রাজনীতির কচকচানি নয়: রাষ্ট্রপতি

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে যুগোপযোগী করার আহ্বান; মাদক, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য মোকাবিলায় তরুণদের এগিয়ে আসতে বললেন মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে যুবসমাজের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; একই সঙ্গে দেশ গঠন ও উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। এ জন্য তরুণদের কর্মমুখী করা, উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে উপযুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

রোববার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় যুব দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘জব ফেয়ার-২০২৬’ উদ্বোধন করেন। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।

দেশ গঠনে যুবসমাজের ভূমিকার বিকল্প নেই

রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম হয়েছে। এখন দেশ নির্মাণ ও উন্নয়নের জন্য কাজ করার সময়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিল্ড দিস কান্ট্রি, বিল্ড দিস নেশন’।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, বাধা অতিক্রম করে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, যুবকদের দেশ গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তরুণদের এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

‘রাজনীতির কচকচানি বাদ দিতে হবে’

রাষ্ট্রপতি বলেন, সারাক্ষণ রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকলে দেশের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। তাঁর ভাষ্য, দেশের মানুষকে রাজনৈতিক আলোচনা ও বিভাজনের বাইরে এসে উন্নয়ন এবং দেশ গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, সংসদ নির্বাচন ও সংসদ গঠনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চা করা। সংসদের মধ্য দিয়েই বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানের উপযোগী করার আহ্বান

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রয়োজনভিত্তিক বা ‘নিড বেইজড’ করতে হবে। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরও চাকরি পাচ্ছেন না। অথচ কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী বিদেশে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে, যা দেশের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দক্ষ ও শিক্ষিত যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও আয় আরও বাড়ানো সম্ভব।

এ বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মাদকাসক্তি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের তাগিদ

যুবসমাজের জন্য মাদকাসক্তিকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বেকারত্ব ও কাজের সুযোগের অভাব থেকে তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের হতাশা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে হবে। এ জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রচার-প্রচারণা এবং কর্মমুখী উদ্যোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের ভূমিকা

নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুবসমাজকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, এসব সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধে তরুণদের নিজ নিজ এলাকায় সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, জনমত তৈরি করতে হবে এবং সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

তাঁর মতে, সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন নেতিবাচক চর্চা বন্ধে তরুণদের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ দেওয়ার আহ্বান

তরুণ উদ্যোক্তাদের বিকাশে সরকারের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা স্বাবলম্বী হতে পারেন।

শুধু বড় কোম্পানিগুলোকে ঋণ দিলে চলবে না উল্লেখ করে তিনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও আর্থিক সহায়তা ও ঋণ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এ ধরনের সহায়তা তরুণদের নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কর্মক্ষম জনসংখ্যার সুবিধা কাজে লাগানোর তাগিদ

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম হওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এ সুবিধা চিরকাল থাকবে না। সময়ের সঙ্গে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়লে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমে যেতে পারে।

তাই বর্তমান যুবশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও পরিবহনসহ সব খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় যুব পুরস্কার ও ইয়ুথ ভলেন্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড প্রদান

জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় যুব পুরস্কার ও ইয়ুথ ভলেন্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁদের অর্জন অন্য তরুণ-তরুণীদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নেভার গিভ আপ’—কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সভাপতিত্ব করেন। এ সময় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবুল খায়ের ভুঁইয়া, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বক্তব্য দেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন