ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকছে জনমত, জেন-জেড ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে বিরোধিতা; ৩ নভেম্বরের ভোট নির্ধারণ করতে পারে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রান্তকাল
ঢাকা, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও কার্যত তাঁর নেতৃত্ব, প্রশাসনের নীতিমালা এবং দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপরই রায় দিতে যাচ্ছেন মার্কিন ভোটাররা।
নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে প্রকাশিত একাধিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, কংগ্রেসের তদারকি এবং এমনকি তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে তরুণ ভোটার, বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন-জেডের রাজনৈতিক অবস্থান এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কী নির্ধারিত হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একে বলা হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন।
এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হবে। পাশাপাশি সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে নিয়মিত ও বিশেষ নির্বাচন মিলিয়ে ৩৫টি আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে।
এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে।
কিন্তু নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করলে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাকে কংগ্রেসে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ বাড়বে।
জনমত জরিপে ট্রাম্পের অবস্থান: অনুমোদনের হার মাত্র ৩২ শতাংশ
নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বার্তা এসেছে জনমত জরিপ থেকে।
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড অনুমোদন করেন মাত্র ৩২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে আনুমানিক ৩২ জন তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তাঁর অবস্থান আরও দুর্বল।
একই জরিপে দেখা গেছে—
- ট্রাম্পের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড অনুমোদন করেন ৩২ শতাংশ।
- অর্থনীতি পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা অনুমোদন করেন ২৫ শতাংশ।
- জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা অনুমোদন করেন মাত্র ২০ শতাংশ।
- সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৫৩ শতাংশ।
- রিপাবলিকানদের সমর্থন ৪৪ শতাংশ।
অর্থাৎ সম্ভাব্য ভোটারদের হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় ৯ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
২২ থেকে ২৬ অক্টোবর পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ১ হাজার ৬৭৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক অংশ নেন।
তবে এই জরিপের ফল সরাসরি নির্বাচনী আসনসংখ্যায় রূপান্তর করা যায় না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচন প্রতিটি কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের পৃথক ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
পিউ রিসার্চের জরিপে আরও উদ্বেগজনক চিত্র
৮ অক্টোবর প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও কম দেখা গেছে।
২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে অংশ নেন ৫ হাজার ৬২ জন মার্কিন নাগরিক।
এই জরিপে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড অনুমোদনের হার পাওয়া যায় মাত্র ৩০ শতাংশ, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৪ শতাংশ জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের বিরোধিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্যদিকে ১৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ অনেক ভোটারের কাছে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি সমর্থন অথবা অসন্তোষ প্রকাশের একটি রাজনৈতিক সুযোগ।
তবে জরিপভেদে ফলাফলের পার্থক্য রয়েছে। নমুনা নির্বাচন, জরিপের সময় এবং প্রশ্নের ধরন অনুযায়ী অনুমোদনের হার পরিবর্তিত হতে পারে।
কেন ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে?
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে মার্কিন ভোটারদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়।
মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আবাসন ব্যয় এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে।
বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাত এবং তার অর্থনৈতিক প্রভাব ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে।
পিউ রিসার্চের অক্টোবরের জরিপে ৮৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার অর্থনীতিকে তাঁদের ভোটের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রচারণায় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নীতির সাফল্য তুলে ধরা হলেও বিরোধীরা অর্থনৈতিক চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হচ্ছে ভোটারদের অংশগ্রহণের আগ্রহ।
রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৪৬ শতাংশ ভোট দিতে অত্যন্ত উৎসাহী বলে জানিয়েছেন। রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে এই হার ৩০ শতাংশ।
এ প্রবণতা ভোটের দিন বাস্তবে প্রতিফলিত হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা সুবিধা পেতে পারে।
জেনারেশন জেড: তরুণ ভোটাররা কোন দিকে?
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জেনারেশন জেড বা জেন-জেড ভোটারদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারীদের জেনারেশন জেড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই প্রজন্মের সবাই এখনো ভোট দেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর।
তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে রয়েছে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষার ব্যয়, আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো বিষয়।
অক্টোবরের রাসমুসেন রিপোর্টস জরিপে ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন পাওয়া গেছে ৫২ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের প্রতি ৩৩ শতাংশ।
অর্থাৎ এই বয়সের ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ১৯ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে।
তবে ৩০ বছরের কম বয়সীদের সবাই জেন-জেড নন। ফলে এই জরিপকে পুরো জেন-জেড প্রজন্মের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের পরিমাপ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
তরুণ ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন বেশি দেখা গেলেও তাদের সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন না।
অর্থনৈতিক সুযোগ, সরকারি ব্যয়, অভিবাসন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের বিষয়ে তরুণদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দের পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে তাঁদের উপস্থিতির হারও নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
প্রতিনিধি পরিষদ হারালে ট্রাম্পের জন্য কী অপেক্ষা করছে?
রয়টার্সের ২৫ অক্টোবর হালনাগাদ করা নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদ দখলের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর কংগ্রেসের তদারকি বাড়তে পারে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসে হাজির হওয়ার নির্দেশ, সরকারি নথি তলব, বিভিন্ন নীতির তদন্ত এবং বাজেট নিয়ে দর-কষাকষি জোরদার হতে পারে।
তবে শুধু প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের সব নীতি বন্ধ করতে পারবে না।
কারণ প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা থাকবে এবং সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণও অর্জন করলে বিচারক নিয়োগ, মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে অনুমোদন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ট্রাম্প কি তৃতীয়বার অভিশংসিত হতে পারেন?
এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক প্রশ্ন হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আবারও অভিশংসনের মুখোমুখি করা হবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্পই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি দুবার প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছেন।
২০১৯ এবং ২০২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ অনুমোদিত হয়েছিল। তবে উভয়বারই সিনেটে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি।
২০২৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় হলে তাঁর বিরুদ্ধে তৃতীয়বার অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অভিশংসনের উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রতিনিধি পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন।
কিন্তু তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে পদচ্যুত করতে সিনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
ফলে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে জয় পেলেও সিনেটে পর্যাপ্ত সমর্থন ছাড়া ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা সম্ভব হবে না।
জরিপে অভিশংসনের সম্ভাবনা নিয়ে কী বলছেন ভোটাররা?
রাসমুসেন রিপোর্টসের ৩১ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পরিচালিত জরিপে অংশ নেওয়া সম্ভাব্য ভোটারদের ৭৭ শতাংশ মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পকে অভিশংসনের চেষ্টা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ মনে করেন, এমন উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত সম্ভাব্য।
অন্যদিকে ১৬ শতাংশ মনে করেন, অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
এই জরিপে ১ হাজার ৫ জন সম্ভাব্য ভোটার অংশ নেন। জরিপটির নমুনাগত ত্রুটির সীমা ছিল প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
জরিপের ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পকে অভিশংসন করার পক্ষে মত দিয়েছেন—এমন নয়। তাঁরা মূলত ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পদক্ষেপ সম্পর্কে নিজেদের ধারণা জানিয়েছেন।
সুতরাং এই ফলাফলকে ট্রাম্পের অভিশংসিত হওয়ার নির্দিষ্ট সম্ভাবনা হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
বাস্তবে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল, ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, সম্ভাব্য অভিযোগের ভিত্তি এবং কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোন কোন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়েছেন?
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তিনজন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। তবে ট্রাম্প দুবার অভিশংসিত হওয়ায় প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে মোট চারবার অভিশংসন অনুমোদনের ঘটনা ঘটেছে।
অ্যান্ড্রু জনসন: ১৮৬৮
যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসন ১৮৬৮ সালে অভিশংসনের মুখোমুখি হন।
তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধমন্ত্রী এডউইন স্ট্যান্টনকে অপসারণের মাধ্যমে তৎকালীন টেনিউর অব অফিস আইন লঙ্ঘন।
সিনেটে বিচারের সময় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পাওয়া যায়নি।
মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে তিনি পদচ্যুতি থেকে রক্ষা পান।
বিল ক্লিনটন: ১৯৯৮
যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ১৯৯৮ সালে অভিশংসিত হন।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল শপথ নিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা।
এই অভিযোগগুলো হোয়াইট হাউসের সাবেক শিক্ষানবিশ মনিকা লিউইনস্কিকে কেন্দ্র করে তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
১৯৯৯ সালে সিনেটের বিচারে ক্লিনটন দোষী সাব্যস্ত হননি। ফলে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: প্রথম অভিশংসন, ২০১৯
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রথম অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কংগ্রেসের তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে ঘিরে তদন্তের জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগ।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেট তাঁকে অভিযোগগুলো থেকে খালাস দেয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: দ্বিতীয় অভিশংসন, ২০২১
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনে হামলার পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৩ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
সিনেটের বিচারে ৫৭ জন সিনেটর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে এবং ৪৩ জন বিপক্ষে ভোট দেন।
কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায় ট্রাম্প খালাস পান।
এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয়বার অভিশংসিত হওয়ার প্রথম ঘটনা।
রিচার্ড নিক্সন: অভিশংসনের আগেই পদত্যাগ
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নামও অভিশংসনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলেও প্রতিনিধি পরিষদে চূড়ান্ত ভোটের আগেই তিনি ১৯৭৪ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন।
ফলে নিক্সন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসিত প্রেসিডেন্টদের তালিকায় নেই।
ট্রাম্প অভিশংসিত হলে কী ঘটবে?
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয়বার অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে প্রথমেই বিষয়টি সিনেটে বিচারের জন্য পাঠানো হবে।
সিনেটে বিচার চলাকালে প্রেসিডেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত হন না।
তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারবেন।
সিনেটের বিচারে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অপসারণ করা হবে।
সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
অন্যদিকে সিনেটে দোষী সাব্যস্ত না হলে ট্রাম্প দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারবেন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অভিশংসনের মাধ্যমে পদচ্যুত হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভবিষ্যতে সরকারি পদে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে যাওয়া নয়। নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পদধারণে অযোগ্যতার প্রশ্নও নির্ধারিত হতে পারে।
ট্রাম্পকে সত্যিই ক্ষমতা থেকে সরানো কতটা সম্ভব?
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন অভিশংসন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা এবং তাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের সম্ভাবনার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করলে তদন্ত ও অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপনের পথ খুলতে পারে।
কিন্তু সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন।
এমনকি ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য রিপাবলিকান সিনেটরদের উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।
তাই বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, ডেমোক্র্যাটদের বড় বিজয়ের পর অভিশংসন উদ্যোগের রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হলেও ট্রাম্পের প্রকৃত পদচ্যুতির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
অবশ্য ভবিষ্যতে নতুন কোনো গুরুতর অভিযোগ, তদন্তের ফলাফল কিংবা রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলে এই হিসাব বদলে যেতে পারে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব পড়বে
৩ নভেম্বরের নির্বাচন শুধু ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের শেষ দুই বছরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক ভিত্তিও তৈরি করতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা বড় ব্যবধানে জয়ী হলে সেটিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি নতুন করে জনসমর্থনের দাবি করতে পারবেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে ২০১৬ ও ২০২৪ সালে দুইবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে প্রচলিত সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী তিনি ২০২৮ সালে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন।
এ কারণে ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং ট্রাম্প-পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের জন্য কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঐতিহাসিকভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রায়ই প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারায়।
এবারের পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তা, অর্থনৈতিক অসন্তোষ, ডেমোক্র্যাট ভোটারদের তুলনামূলক বেশি উৎসাহ এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিরোধী দলের প্রতি সমর্থন রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তবে নির্বাচনী জরিপের জাতীয় ব্যবধানই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে না। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ও নির্বাচনী এলাকায় ভোটার উপস্থিতি, স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করলে ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও কঠোর কংগ্রেশনাল তদারকি, তদন্ত এবং সম্ভাব্য অভিশংসন বিতর্কের মুখোমুখি হতে হবে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে তুলনামূলক বেশি রাজনৈতিক সুবিধা পাবেন।
সব মিলিয়ে আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, তাঁর প্রশাসনের জবাবদিহি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বিশেষ বিশ্লেষণ: প্রান্তকাল আন্তর্জাতিক ডেস্ক

