নদ থেকে লাশ উদ্ধারের তিন দিন পর উত্তরখান থানায় মামলা; নৌ-পুলিশ করবে তদন্ত
তুরাগ নদ থেকে বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ছেলেকে হত্যার অভিযোগে মামলা করেছেন তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। ঘটনার পর মামলা করার বিষয়ে অনীহার কথা জানালেও লাশ উদ্ধারের তিন দিন পর শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় তিনি এ মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. রেজাউল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাহসিফকে হত্যার অভিযোগ এনে তার বাবা একটি মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে।”
মামলাটি তাহসিফের লাশ উদ্ধারকারী নৌ-পুলিশ তদন্ত করবে বলে জানান তিনি। নৌ-পুলিশের এসপি মাসুমা আক্তারও বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলাটির তদন্ত তারাই করবেন। তবে এখনো তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয়নি।
মামলা করতে অনীহা ছিল বাবার
মামলা করার কয়েক ঘণ্টা আগেও ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওপর তাঁর আস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, “মামলার বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব। মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ বিষয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মামলা মানেই আমাদের দেশে একটা ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এরকম ঝামেলার মধ্যে পড়তে?”
তিনি আরও বলেন, “যেখানে আমাদের চমৎকার সরকার রয়ে গেছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি, তারা অত্যন্ত দায়িত্ববান, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে।”
ছেলের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনে সরকারের আন্তরিকতা প্রত্যাশা করে তাহসিফের বাবা বলেন, “আমরা চাই একজন সুনাগরিক হিসেবে… সে একজন পাইলট, দেশের জন্য অ্যাসেট ছিল। সরকার নিশ্চয়ই তার বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক হবে, অত্যন্ত দায়িত্বশীল হবে এ বিষয়ে তথ্য উদঘাটন করতে।”
এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সে বিষয়ে সরকার আন্তরিক পদক্ষেপ নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পুলিশ হেফাজতে তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই দীপ
তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বর্তমানে উত্তরখান থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তবে তাঁর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে, সে সম্পর্কে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
ঘটনার দিন মধ্যরাত পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে থাকার বিষয়টি আলোচনায় আসার পর বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তিন দিনেও মামলা না হওয়ায় তাঁকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরে শুক্রবার রাতে তাঁকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে তাহসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করার পরও দীপকে উত্তরখান থানা পুলিশের হেফাজতেই রাখা হয়েছে।
তুরাগ থেকে উদ্ধার হয় তাহসিফের লাশ
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় আসা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ বুধবার বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তাহসিফ। বৃহস্পতিবার দীপ জানিয়েছিলেন, একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি।
পরে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পিবিআইয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে মধ্যরাতের ঘটনা
‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত টঙ্গীর ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা দীপ স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে তাঁকে নিয়ে শুক্রবার এলাকাটি পরিদর্শনে যান পিবিআই কর্মকর্তারা।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে তাঁরা সেখানে অবস্থান করার সময় পুলিশের একটি দল তাঁদের ধাওয়া দেয়। এ সময় দীপ তুরাগ তীরে স্থাপিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। এরপর সুযোগ বুঝে দীপ সেখান থেকে সরে যান এবং রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাসায় ফেরেন বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
গভীর রাতে দুজন কেন সেখানে অবস্থান করছিলেন, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা বিষয়টি জেনেছি, এটা একটু সেনসিটিভ। আরেকটু ক্রসচেক করে নিই।”
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান শুক্রবার জানিয়েছিলেন, দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

