শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

১১ বিষয়ে নম্বর বাড়িয়ে পাস, শিক্ষার্থী ও বোর্ডের তিন অপারেটরের বিরুদ্ধে মামলা

১১ বিষয়ে নম্বর বাড়ানোর প্রমাণ তদন্তে, বোর্ডের তিন অপারেটর ও শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা

চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় ১০ বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পরও ১১ বিষয়ে নম্বর বাড়িয়ে এক শিক্ষার্থীকে পাস করানোর অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় জালিয়াতিতে সহযোগিতার অভিযোগে বোর্ডের কম্পিউটার শাখার তিন অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষার্থীর পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে শূন্য নম্বর থাকলেও প্রকাশিত ফলাফলে দেখানো হয় ৪৫। একইভাবে উচ্চতর গণিতে শূন্যের পরিবর্তে দেওয়া হয় ৪৬ নম্বর। গত ৩০ অক্টোবর নগরের পাঁচলাইশ মডেল থানায় বোর্ড সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলার আসামিরা হলেন কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০), কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হান (৩২) এবং শিক্ষার্থী হাসিবুল আলী শোভন (১৭)। তদন্তে শনাক্তযোগ্য অন্য ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা সহযোগীদেরও এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নম্বর জালিয়াতির অভিযোগে একাধিক ধারায় মামলা

আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৭৭(ক) ধারা এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০-এর ৫, ৬, ১২ ও ১৩ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে এক শিক্ষার্থীসহ বোর্ডের তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বোর্ডের সচিব মামলাটির বাদী। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

১১ বিষয়ে নম্বর বাড়ানোর প্রমাণ

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, এসএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার পর পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে শূন্য নম্বর থাকা সত্ত্বেও কম্পিউটার সেলের প্রিন্ট আউটে ৪৫ নম্বর দেখতে পান দায়িত্বপ্রাপ্ত পরীক্ষক। বিষয়টি বোর্ডকে জানানোর পর অন্য বিষয়গুলোর নম্বরেও অসংগতি পাওয়া যায়।

গত ২৫ আগস্ট বোর্ড চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দুজন আইসিটি বিশেষজ্ঞের কারিগরি সহায়তায় কমিটি মূল উত্তরপত্র, পরীক্ষকদের হাতে লেখা নম্বর ফর্দ, প্রকাশিত ফলাফল, এমসিকিউর ওএমআর শিট এবং কম্পিউটার সেলের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে। গত ৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

আগেই সন্দেহের তালিকায় ছিলেন তিন অপারেটর

গত আগস্টে ফল পুনর্নিরীক্ষণের সময় নম্বরের গরমিল ধরা পড়ার পর কম্পিউটার সেলের সংশ্লিষ্ট তথ্য কোন স্ক্যানিং মেশিন থেকে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছিল, তা যাচাই করে বোর্ড। মেশিন নম্বর, কর্মীদের দায়িত্ব পালনের সময় এবং সংশ্লিষ্ট দিনের কাজের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিন অপারেটরকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। কারিগরি যাচাইয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও নেওয়া হয়। পরে তাঁদের কাজ থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তখন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে দেওয়া বক্তব্যে অভিযুক্ত তিন কর্মচারীই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, স্ক্যানিং, সর্টিং ও সলভিংয়ের কাজে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদাভাবে শনাক্ত করে নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে এবার তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বোর্ডে আগেও উঠেছে ফল জালিয়াতির অভিযোগ

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালে আগের বছরের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সময় ৩৪টি উত্তরপত্রে পাওয়া নম্বরের চেয়ে বেশি নম্বর ফলাফল শিটে ইনপুট দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে।

ওই ঘটনায়ও বোর্ডের কম্পিউটার শাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা জানানো হলেও পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এর আগে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও ১৭ শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনা সামনে আসে। পরে তাঁদের ফল বাতিল করে বোর্ড।

এ ছাড়া ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বোর্ডের তৎকালীন সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর ফল বাতিল করা হয়। পরে নারায়ণ চন্দ্র নাথ, তাঁর ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ, সাবেক সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান এবং সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তদন্ত শেষে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

বারবার এমন অভিযোগ ওঠায় শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রক্রিয়া, কম্পিউটার সেলের তথ্যের নিরাপত্তা এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন