শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাড়ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় ঝুঁকি

গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে জিডিপির ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এর সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ভূমি দেবে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উচ্চমাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ দেশের প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্টে’ বাংলাদেশের জন্য এমন উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূমি দেবে যাওয়া এবং চরম আবহাওয়ার প্রভাবে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে ভূমি দেবে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় বদ্বীপ ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বদ্বীপের কিছু অংশ বছরে ৪ থেকে ৫৫ মিলিমিটার পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তায়। একই সঙ্গে মানুষের বসতভিটা, সম্পদ এবং জীবন-জীবিকা রক্ষাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

স্বাস্থ্য ও জীবিকার অনিশ্চয়তায় বাড়ছে অভিবাসন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বসতভিটা ও কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিরাপদ পানির সংকট, জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং বসবাসের প্রতিকূল পরিবেশের কারণে উপকূলের কিছু মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, অধিক লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের অনেকে উপকূল ছেড়ে ঢাকা কিংবা অন্য শহরাঞ্চলে চলে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ এই অভিবাসনের ফলে যেসব এলাকায় তাঁরা আশ্রয় নিচ্ছেন, সেখানেও পরিবেশের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।

অভিযোজন ও অবকাঠামো শক্তিশালী করার তাগিদ

উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এ জন্য জলবায়ু সহনশীল উপকরণ ও বীজ ব্যবহার এবং উপকূলীয় এলাকার অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় কোথায় এবং কীভাবে আশ্রয় নিতে হবে, সে বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাবে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর অভিযোজন উদ্যোগ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন