বাস রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির সুফল নিশ্চিত করতে মালিক, শ্রমিক, পুলিশ ও সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান
রাজধানী ঢাকার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, পুলিশ ও সাংবাদিকদের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক ও পরিবহন নেতা এডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি। তিনি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট চার পক্ষের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক সমঝোতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
রোববার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ঢাকা শহরে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে ছয়টি বাস রুটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ছয় বাস রুটের উদ্যোগে নগরবাসীর নতুন আশার কথা
শিমুল বিশ্বাস বলেন, নানা সংকট ও দুর্বিপাকের মধ্যেও রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করবে। ঢাকা শহরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, অসহনীয় যানজট এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাহীনতার অবসান সবাই চান। তবে এ পরিস্থিতি বদলাতে কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রজেক্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা নগরে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করছে। প্রায় চার কোটি মানুষের এই নগরে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিবহন খাতের চার পক্ষকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
রাজধানীর সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় চারটি পক্ষের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন শিমুল বিশ্বাস। তাঁর মতে, পরিবহন শ্রমিক, মালিক, পুলিশ ও সাংবাদিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিককে দায়িত্বশীল হতে হবে। পরিবহন খাতে বিনিয়োগকারী মালিকদেরও নিয়মনীতি মেনে ব্যবসা পরিচালনায় এগিয়ে আসতে হবে। সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিশেষ করে ট্রাফিক বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, এই চার পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব। পরিবহন খাতের সবাইকে নিজ নিজ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে আসতে হবে।
রাজধানীর যানজট দেশের ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলে
ঢাকাকে বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্রের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন শিমুল বিশ্বাস। তিনি বলেন, বিদেশি অতিথিরা বিমানবন্দর থেকে সচিবালয় কিংবা কোনো হোটেলে যাওয়ার পথে রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজট দেখলে পুরো দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে ফিরে যেতে পারেন।
তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো নির্দিষ্ট পরিবহন মালিক, শ্রমিক বা ব্যক্তির ভাবমূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে। তাই রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বিশৃঙ্খলা দেশের অগ্রযাত্রার পথে বড় বাধা। একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও পড়বে।
যানজটে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি
ঢাকার সড়কে রিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের আধিক্যের বিষয়টি তুলে ধরে শিমুল বিশ্বাস বলেন, এসব যানবাহন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে সড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ, যাতায়াতে দীর্ঘ সময় নষ্ট হওয়া এবং কর্মঘণ্টার অপচয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, যানজটের কারণে প্রতিদিন যে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তা হিসাব করলে সমস্যাটির ব্যাপকতা বোঝা যায়। রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেলে মানুষের কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে সময় কম লাগবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
পরিবহন খাতের উদ্যোগ বাস্তবায়নে জবাবদিহির ওপর জোর
অতীতে বিভিন্ন সরকার পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেও নানা প্রতিবন্ধকতা ও স্বার্থান্বেষী মহলকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে সেসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি বলে মন্তব্য করেন শিমুল বিশ্বাস।
তবে এবার পরিবর্তনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করেছেন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, নতুন উদ্যোগ যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে কিংবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্যেই শেষ না হয়। এর বাস্তব সুফল নগরবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতের সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি ও সমালোচনার বিষয়গুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবগত। এসব বিষয়ে আত্মসমালোচনা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। মালিক ও শ্রমিক নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটি সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
মানবসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানোর আহ্বান
বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে শিমুল বিশ্বাস বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এ দেশের মানুষ। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। এ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও পরিবহনসহ সব খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, সমুদ্রসম্পদ, পাহাড় ও বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যেতে পারবে। দেশের সব সংগ্রাম ও লড়াইয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত দুঃখ, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অনাচার থেকে মুক্ত হয়ে একটি নিরাপদ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মশিউর রহমান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এম এ বাতেন ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

