নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, শিলংয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই, দেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—বহু অধ্যায়ে গড়ে উঠেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন
প্রশাসনিক চাকরি থেকে রাজনীতি, বিএনপির আন্দোলনের মুখপাত্র হওয়া, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, ভারতের শিলংয়ে দীর্ঘ অবস্থান এবং দেশে ফিরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ—সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক জীবন নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্যকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে সালাহউদ্দিন আহমদের সমালোচনা করে দাবি করেন, ঘের দখল, দুর্নীতি ও ঘুষের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে ইশরাক হোসেনের মতো তরুণদের ভুগতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যক্তিকে সরিয়ে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দেওয়া গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সমাধান হয় না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের দাবি, রাজনৈতিক ও নীতিগত বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদের অবস্থানের কারণেই তিনি বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ছেন। তাঁদের মতে, সংবিধান, সংসদীয় কার্যপ্রণালি ও রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে তাঁর জ্ঞান এবং যুক্তিনির্ভর বক্তব্য বিএনপির অবস্থান তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রশাসন থেকে রাজনীতিতে
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সিকদারপাড়া গ্রামে জন্ম সালাহউদ্দিন আহমদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও অংশ নেন।
রাজনীতিতে আসার আগে সপ্তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। পরে আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন।
এরপর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চলে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
বিএনপির মুখপাত্র ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা
২০০৮ সালের পর বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালে সালাহউদ্দিন আহমদ আরও সক্রিয় হন। ২০১০ সালে দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হন। পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে কারাবন্দি থাকায় তাঁর এ ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার একটি বাসা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করে বিএনপি ও তাঁর পরিবার। প্রায় দুই মাস পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে তাঁর সন্ধান মেলে। সেখানে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং দীর্ঘ সময় দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকতে হয়।
শিলং থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে ফেরার পথ তৈরি হয় সালাহউদ্দিন আহমদের। ওই বছরের আগস্টে দেশে ফিরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। পরে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন ও সাংবিধানিক বিভিন্ন বিষয়ে দলীয় অবস্থান তুলে ধরেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপির প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশ নেন তিনি। ২০২৫ সালের ২ জুন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংস্কারবিষয়ক বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিএনপি সংস্কার প্রক্রিয়ায় মতামত দিয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কার আলোচনা দ্রুত শেষ করে নির্বাচনের পথে এগোনোর পক্ষে অবস্থান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন সালাহউদ্দিন আহমদ। একসময় বিরোধী দলের মুখপাত্র হিসেবে আন্দোলনে ভূমিকা রাখা এই রাজনীতিক এখন আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সামনে রয়েছে অপরাধ দমন, পুলিশের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা, মানবাধিকার রক্ষা এবং জনগণের নিরাপত্তা জোরদারের চ্যালেঞ্জ।
নয় মাসে সাত ধরনের অপরাধের মামলা কমেছে ৭.১ শতাংশ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে সাত ধরনের অপরাধে মামলার সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৩২৬টি বা ৭.১ শতাংশ। এসব অপরাধে মামলার সংখ্যা ১৮ হাজার ৬৬১টি থেকে কমে ১৭ হাজার ৩৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মামলা কমেছে ৯.২ শতাংশ।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দাঙ্গার মামলা ৬২টি থেকে কমে ১৭টি, ডাকাতির মামলা ৫৩৮টি থেকে ৩৮৭টি এবং খুনের মামলা ২ হাজার ৯১৩টি থেকে কমে ২ হাজার ৬৫৯টি হয়েছে।
এ ছাড়া অপহরণের মামলা ৮১২টি থেকে কমে ৭৬৯টি, শিশু নির্যাতনের মামলা ৩ হাজার ৫৯১টি থেকে ৩ হাজার ১৫১টি, নারী নির্যাতনের মামলা ৯ হাজার ২৬২টি থেকে ৮ হাজার ১৭৮টি এবং দস্যুতার মামলা ১ হাজার ৪৮৩টি থেকে ১ হাজার ৩৭৪টিতে নেমেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কয়েকটি প্রধান অপরাধের ঘটনা কমেছে এবং এতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক প্রচেষ্টাকে এ অগ্রগতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে মামলার সংখ্যা কমা একাই অপরাধ পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র বা পরিবর্তনের কারণ নিশ্চিত করে না। অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা, অভিযোগ জানানোর প্রবণতা এবং মামলা নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়াও পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করতে পারে।
শিক্ষক ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের মূল্যায়ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান সময়ের আলোকে বলেন, ‘সালাহউদ্দিন আহমদ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় নিয়মিত ক্লাস করতে পারতেন না। তবে পরীক্ষার আগে পড়াশোনার বিষয়ে আমার পরামর্শ নিতেন। মাস্টার্সে ১২০ জনের মধ্যে তিনি ১৫তম হয়েছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী ও সদালাপি।’
তিনি জানান, পড়াশোনা শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। পরে খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসেন।
শিলংয়ে তাঁর অবস্থান প্রসঙ্গে অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান বলেন, সেখানে তাঁকে আইনি লড়াই করতে হয়েছে এবং দেশে ফেরার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদকে ভারতপন্থি বা ‘র’-এর এজেন্ট বলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তিনি বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন। তাঁকে দেশপ্রেমিক ও বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিবিদ হিসেবেই জানি।’
বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান সময়ের আলোকে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের রাজনীতিতে সততা, নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রতীক। তাঁর দাবি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখার পর বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করার সময় তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্কে জড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান, সংসদ ও সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন। তাঁর মতে, এ ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া উচিত।
প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিক, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা থেকে শিলংয়ে দীর্ঘ অবস্থান এবং দেশে ফিরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ—সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক জীবনের এসব অধ্যায় তাঁকে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির আলোচিত ব্যক্তিত্বদের একজন করে তুলেছে।

