বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

গারো পাহাড়ে মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়ছে, স্থায়ী সমাধানের দাবি

১২ বছরে হাতির আক্রমণে ২৯ জন নিহত, ক্ষতিগ্রস্ত ৮২৯টি বাড়িঘর; সীমান্তের বন্ধ গেট খুলতে ভারতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ

শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় বন্য হাতি ও মানুষের সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতি করছে, বাড়ছে মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি। অন্যদিকে, খাদ্যসংকট ও চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র হারাচ্ছে হাতিরাও। এ পরিস্থিতিতে বন বিভাগের নজরদারি বৃদ্ধি, হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ এবং সীমান্তের গেট খুলতে ভারতের সঙ্গে আলোচনাসহ সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শেরপুরে হাতির আক্রমণে ২৯ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে গাছপালাসহ ৮২৯টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, মানুষের তৈরি বৈদ্যুতিক ফাঁদসহ বিভিন্ন কারণে ৩০টি বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। এসব তথ্য মানুষ ও বন্যপ্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

বনাঞ্চলে প্রায় ১২০টি হাতির বিচরণ

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শেরপুরের সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১২০টি বন্য হাতি বিচরণ করছে। কয়েকটি দলে বিভক্ত এসব হাতির দলে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে।

নালিতাবাড়ী উপজেলার কাটাবাড়ি ও মধুটিলা, ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচি, ছোট গজনী ও বড় গজনী এবং শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী ও রানী শিমুল ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকাসংলগ্ন বনাঞ্চলে হাতির বিচরণ রয়েছে। বর্তমানে হাতির দলগুলো নালিতাবাড়ী উপজেলার বুরুঙ্গা-পোড়াবাড়ি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান করছে বলে বন বিভাগ জানিয়েছে।

মধুটিলা রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আব্দুল করিম জানান, হাতিগুলো শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় হাতিরা প্রায়ই কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

সীমান্তের বন্ধ গেটে বাধাগ্রস্ত হাতির চলাচল

জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে ১৫ থেকে ২০টি বন্য হাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরবর্তী সময়ে বংশবিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় হাতিগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে নিয়মিত চলাচল করত।

২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মেঘালয়সংলগ্ন শেরপুর এলাকায় কয়েক কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। তখন হাতির চলাচলের সুবিধার্থে ৪৪টি গেট এবং নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছিল। তবে পরে এসব গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মেঘালয় থেকে আসা হাতিগুলো আগের আবাসস্থলে ফিরতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়া, বনাঞ্চলে খাদ্যের ঘাটতি এবং মানুষের কৃষিজমি ও বসতি সম্প্রসারণ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই হাতি তাড়ানোর তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি তাদের চলাচলের পথ ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

রাত জেগে ফসল পাহারা দেন কৃষকেরা

গারো পাহাড়ের সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষকদের জন্য হাতির উপদ্রব নিয়মিত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের আলোয় ফসলের পরিচর্যা করেন তাঁরা। আর রাত নামলেই শুরু হয় ফসল পাহারা। কেউ টর্চলাইট জ্বালিয়ে, কেউ আগুনের আলো দেখিয়ে, আবার কেউ দল বেঁধে হাঁকডাক করে হাতির পাল ঠেকানোর চেষ্টা করেন। তবু কোনো কোনো রাতে হাতির আক্রমণে কয়েক মাসের পরিশ্রমে ফলানো ফসল নষ্ট হয়ে যায়।

ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া এলাকার কৃষক সুনীল মারাক বাসসকে বলেন, “আমরা কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। অনেক কষ্ট করে জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল ফলাই। কিন্তু বন্য হাতি রাতে এসে ক্ষেতের সব ফসল নষ্ট করে দেয়। এক রাতেই আমাদের কয়েক মাসের পরিশ্রম শেষ হয়ে যায়। হাতির ভয়ে রাতে জমি পাহারা দিতে হয়, আবার জীবনের ঝুঁকিও থাকে।”

ফসল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা এলাকার কৃষক চিন্ময় ম্রং বলেন, “হাতির ভয়ে আমরা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। কখন হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, কখন ঘরবাড়ি বা ফসলের ক্ষতি করে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষ আহত হওয়ার বা প্রাণ হারানোর আশঙ্কাও থাকে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা হাতি মেরে ফেলতে চাই না। আমরা চাই মানুষ ও হাতি দুই পক্ষই নিরাপদে থাকুক। এজন্য বন বিভাগের নিয়মিত নজরদারি, আগাম সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় মানুষের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।”

শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী এলাকার কৃষক হারেজ আলীর মতে, শুধু হাতি তাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনের খাদ্য ও আবাসস্থলের উন্নয়ন, ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং গ্রামবাসীর সঙ্গে বন বিভাগের সমন্বয় বাড়াতে হবে।

ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোটি টাকার সহায়তা

ময়মনসিংহ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে মানুষ-হাতির সংঘাতে প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

বন বিভাগ জানায়, এসব ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ৫৫ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ৯ লাখ টাকা এবং বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পরিবারগুলোকে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা সরকারি সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরও ফসলের ক্ষতি, প্রাণহানির আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতা কাটছে না। তাই ক্ষয়ক্ষতির পর সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

মধুটিলা রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আব্দুল করিম বলেন, হাতির লোকালয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে তাদের চলাচলের পথ প্রশস্ত করা, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং মানুষের কৃষিজমি ও বসতি সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ

গত ১০ অক্টোবর শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে মানুষ-হাতির সংঘাত নিরসন ও বন্য হাতি সংরক্ষণবিষয়ক এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, “বিদ্যমান প্রটোকলের আওতায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

হাতির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী আরও বলেন, “শেরপুরের বনাঞ্চলকে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্য হাতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।”

মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থান জরুরি

শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় মানুষ ও হাতির সংঘাত এখন শুধু ফসলের ক্ষতি কিংবা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। একদিকে কৃষকেরা ফসল ও পরিবার রক্ষায় রাত জাগছেন, অন্যদিকে খাদ্য ও নিরাপদ চলাচলের সংকটে হাতিরা লোকালয়ের দিকে আসছে।

বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের প্রশিক্ষক আদনান আজাদ বাসসকে বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাতির নিরাপদে বেঁচে থাকার পরিবেশ গড়ে তুলতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলে আতঙ্কিত হয়ে হাতিকে ঘিরে ধরা, আঘাত করা কিংবা অনিরাপদভাবে তাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত রেসপন্স টিমের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং বন বিভাগের সঙ্গে মানুষের সমন্বয় জোরদার করেও সংঘাত কমানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্তের গেট নিয়ে ভারতের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা, হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনাঞ্চলের খাদ্য ও আবাসস্থলের উন্নয়ন, আগাম সতর্কবার্তা, ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

মানুষ ও বন্য হাতি—উভয়ের জীবন রক্ষায় এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে গারো পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সংঘাত কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সীমান্তবাসীর প্রত্যাশা, ফসল রক্ষার ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে পাহাড়ি জনপদে মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করা হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন