বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবলে বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে চায় তুরস্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার চুক্তি পেতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম তুরস্কভিত্তিক সেলেবি এভিয়েশন। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেলে বৈদ্যুতিক গ্রাউন্ড-সাপোর্ট সরঞ্জাম, জনবল প্রশিক্ষণ এবং সেবার মানোন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সেলেবি এভিয়েশন বিশ্বজুড়ে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কার্গো হ্যান্ডলিং ও ওয়্যারহাউস ব্যবস্থাপনার সেবা দিয়ে আসছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের প্রায় ৭০টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ঢাকার তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের চুক্তির সম্ভাব্য প্রতিযোগীদের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসার আগ্রহ, বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনার মান, পরিচালনাগত দক্ষতা এবং চলমান দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) সিনিয়র স্টাফ করেসপন্ডেন্ট কামরান সিদ্দিকীর সঙ্গে এক ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন সেলেবি এভিয়েশনের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডেভ ডরনার।
বাংলাদেশের বাজার নিয়ে আশাবাদী সেলেবি
ডেভ ডরনার বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সেলেবি বাংলাদেশের বাজার পর্যবেক্ষণ করছে। অবশেষে প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ায় তারা আনন্দিত। তাঁর মতে, বাংলাদেশ সেলেবির জন্য উপযুক্ত বাজার, একইভাবে সেলেবিও বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান।
তিনি বলেন, সেলেবির ব্যবসায়িক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে দ্রুত বর্ধনশীল ও উদীয়মান বাজার। এসব বাজারে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের সক্ষমতা সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস। বাংলাদেশের বর্তমান সুযোগও প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডরনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং গ্রাহক—সব পক্ষই দ্রুত সেবার পরিধি বাড়ানো ও মান উন্নয়নে আগ্রহী। ব্যক্তিগতভাবেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রায় ১০ বছরের। এ দেশের সেবা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের বাইরে অন্য কোনো খাতে কাজের সুযোগ তৈরি হলেও সেলেবি তা বিবেচনা করবে বলে জানান তিনি। বিশ্বের বড় ও জটিল বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ছোট বিমানবন্দরেও প্রতিষ্ঠানটি এয়ারলাইন্স, যাত্রী, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ও পণ্য পরিবহনকারীদের সেবা দিয়ে থাকে।
বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে বিনিয়োগের পরিকল্পনা
বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেলে যন্ত্রপাতি ও জনবলের পেছনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে চায় সেলেবি। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গ্রাউন্ড-সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট (জিএসই) ব্যবহারে যতটা সম্ভব বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
ডরনার জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও বালিতে কার্যক্রম শুরু করার সময় ওই দুটি বড় স্টেশনের প্রায় ৯৩ শতাংশ যন্ত্রপাতি ছিল বৈদ্যুতিক ও সম্পূর্ণ নতুন। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্রাথমিক ব্যয় তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় কম। পাশাপাশি পরিবেশগত সুবিধাও রয়েছে।
তিনি বলেন, যন্ত্রপাতির নির্ভরযোগ্যতা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব গ্রাউন্ড অপারেশন এয়ারলাইন্স, সরকার, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও যাত্রীদের কার্বন নিঃসরণ কমাতেও সহায়তা করে।
তবে নতুন যন্ত্রপাতির অর্ডার দেওয়ার পর সেগুলো হাতে পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সে কারণে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে পারলে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্য দেশে সেলেবির চলমান কার্যক্রম থেকে কিছু যন্ত্রপাতি এনে মোতায়েন করার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান তিনি।
ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবায় উন্নতির লক্ষ্য
ঢাকার বর্তমান টার্মিনালে ব্যাগেজ পেতে দেরি হওয়া এবং চেক-ইনের দীর্ঘ সারি নিয়ে যাত্রীদের অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরে ডরনার বলেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সেবার নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা জরুরি।
তাঁর মতে, টার্মিনাল পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করা এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য সেবার মান নির্ধারণ করে দিলে তা কার্যক্রমের মানোন্নয়নে সহায়ক হবে। সেলেবির লক্ষ্য হবে নির্ধারিত মানদণ্ডের নিচে না নামা এবং নিম্নমানের সেবার কারণে জরিমানা এড়ানোর পরিবর্তে শুরু থেকেই সঠিকভাবে সেবা দেওয়া।
ডরনার বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকার বিমানবন্দর বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরগুলোর সমপর্যায়ের সেবা দিতে সক্ষম হতে পারে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই মান ছাড়িয়েও যেতে পারে।
তবে ব্যাগেজ সরবরাহের বিলম্বের জন্য শুধু গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংকে দায়ী করা যায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা এবং নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেক দেরিতে উড়োজাহাজ অবতরণের মতো বিষয়ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলে। সেলেবির নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষেত্রগুলোতে নির্ধারিত মান পূরণ করা কিংবা তার চেয়েও উন্নত সেবা দেওয়ার চেষ্টা থাকবে বলে জানান তিনি।
দক্ষতা বাড়লে কমতে পারে পরিচালন ব্যয়
ডরনারের মতে, একটি এয়ারলাইন্সের মোট ব্যয়ের প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে খরচ হয়। এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত সর্বনিম্ন ব্যয়ে মানসম্মত সেবা চায়। তাই এ খাতে পরিচালন দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশিক্ষিত কর্মীদের উপযুক্ত কাজে নিয়োজিত করা, সেবার মান-সংক্রান্ত চুক্তির শর্ত মেনে চলা এবং নির্ধারিত সময়ে উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড নিশ্চিত করার মাধ্যমে সেবার মান বাড়ানো সম্ভব। টার্নঅ্যারাউন্ড বলতে একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার সময়কে বোঝায়।
ডরনার বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড নিশ্চিত করতে এয়ারলাইন্সগুলোকে সহায়তা করা গেলে তারা ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা ও সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি টিকিটের দামের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যাত্রী সন্তুষ্টি ও কর্মীদের দক্ষতায় গুরুত্ব
সেলেবির লক্ষ্য সম্পর্কে ডরনার বলেন, তিনি যাত্রী সন্তুষ্টিতে বড় ধরনের উন্নতি দেখতে চান, যাতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও নির্বিঘ্ন ও আনন্দদায়ক হয়। এর মধ্যে রয়েছে সুশৃঙ্খলভাবে সারি ব্যবস্থাপনা, বিমানে ওঠার সহজ প্রক্রিয়া, অবতরণের পর দ্রুত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা এবং কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যাগেজ সরবরাহ।
একই সঙ্গে কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ভালো আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য। এয়ারলাইন্সের সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় সেলেবি।
ডরনারের ভাষায়, বিমানবন্দরকে ঘিরে এমন একটি সফল পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে যাত্রীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি এয়ারলাইন্স, কর্মী, টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও সরকারের চাহিদাও পূরণ হবে।
স্থানীয় সরবরাহকারী ও কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা
উদীয়মান বাজারে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে নিজেদের অন্যতম শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন ডরনার। প্রায় ২০ বছর আগে হাঙ্গেরিতে এবং সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ায় কার্যক্রম শুরু করার অভিজ্ঞতা এ ধরনের বাজারে কাজ করার সক্ষমতা প্রমাণ করে বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বা দুর্বলতা নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তবে চ্যালেঞ্জিং ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে সেলেবির বিশেষ দক্ষতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, শুধু বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানি করার পরিবর্তে স্থানীয় সরবরাহকারী গড়ে তুলতেও প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদারদের প্রয়োজনীয় মানদণ্ড বুঝতে ও তা পূরণে সহায়তা করার মাধ্যমে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
এ ধরনের উদ্যোগ বিমানবন্দরের বাইরেও হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে তাঁর প্রত্যাশা। পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহকারীদের সক্ষমতা বাড়লে সরবরাহ ব্যয় কমতে পারে এবং ভবিষ্যতে তাদের রপ্তানিকারক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ডরনারের মতে, সেলেবির এই ব্যবসায়িক মডেল বিমানবন্দরের কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

