বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

নাব্যতা হারাচ্ছে পায়রা বন্দর, ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ড্রেজিং পরিকল্পনা

নাব্যতা সংকটে কমেছে বড় জাহাজের আগমন, এক বছরে বিদেশি জাহাজ নেমেছে ২৯টিতে; নতুন বিনিয়োগের আগে আগের ড্রেজিংয়ের সুফল ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সচল করতে আবারও ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা সংকট কাটাতে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ১২ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ এবং চ্যানেলের নাব্যতা ৯ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের আশা, চ্যানেলের গভীরতা বাড়িয়ে বড় জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে পায়রা বন্দর কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আগের ড্রেজিংয়ের পরও নাব্যতা সংকট ফিরে আসা, বড় জাহাজের আগমন কমে যাওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও সুশাসনকর্মীরা। তাঁদের মতে, বন্দর সচল করার উদ্যোগের পাশাপাশি আগের প্রকল্পের সুফল, ব্যয় ও জবাবদিহির বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা জরুরি।

দুই বছর ড্রেজিং না হওয়ায় নাব্যতা সংকট

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে পায়রা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে। বন্দরটিকে বড় জাহাজ চলাচলের উপযোগী করতে বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং প্রতিষ্ঠান জান ডি নুল ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন করে।

তবে ওই কাজ শেষ হওয়ার পরবর্তী দুই বছর চ্যানেলে ড্রেজিং না হওয়ায় আবারও পলি জমে নাব্যতা সংকট তীব্র হয়েছে। ফলে বড় জাহাজের সরাসরি বন্দরে প্রবেশের সক্ষমতা কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৬ সালের মে মাসের চার্টের তথ্য অনুযায়ী, কাঠালধার পয়েন্টে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে চ্যানেলের বর্তমান গড় গভীরতা নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিটারে। অবস্থান ও জোয়ারের সময়ভেদে সর্বোচ্চ ড্রাফট পাওয়া যাচ্ছে ৬ দশমিক ৫ মিটার। অথচ ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আগে রাবনাবাদ চ্যানেলের স্বাভাবিক গভীরতা ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৬ মিটার।

এই পরিস্থিতিতে আগের ড্রেজিংয়ের পর অর্জিত গভীরতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায়নি কেন, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বজায় রাখার পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কমেছে বিদেশি জাহাজের আগমন

পায়রা বন্দরের কার্যক্রম শুরুর পর এক দশকে কাস্টমস ও বন্দর মাশুল বাবদ ১ হাজার ৯০৭ দশমিক ৭৯ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দরে বিদেশি বড় জাহাজের আগমন কমেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্দরে বিদেশি বড় জাহাজ আসে ১১১টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে ১২৩টিতে পৌঁছালেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৮৫টিতে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসেছে মাত্র ২৯টি বিদেশি জাহাজ।

জাহাজ চলাচলের এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে নাব্যতা সংকট অন্যতম বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরের টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না। এতে পণ্য পরিবহন ও খালাসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ধাপ এবং ব্যয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ছে কয়লাবাহী জাহাজ

নাব্যতা সংকটের কারণে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লা পরিবহনেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে কয়লাবোঝাই এমভি থেরেসা গ্রেস জাহাজটি বন্দরের বহির্নোঙরে এলেও পর্যাপ্ত গভীরতার অভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে গিয়ে ভিড়তে বাধ্য হয়। সেখান থেকে লাইটার জাহাজ ও বাল্কহেডে করে কয়লা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।

এতে সরাসরি পায়রা বন্দরে বড় জাহাজ ভেড়ানোর সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, চ্যানেলের নাব্যতা বাড়ানো গেলে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পণ্য খালাসের সুযোগ তৈরি হবে এবং পরিবহনব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়তে পারে।

তবে দুই বছর বিরতির পর চলতি বছরের ৭ অক্টোবর পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনালে ভিড়েছে চীনের পতাকাবাহী জাহাজ ‘ফান ঝউ-৬’। বন্দরের জন্য কেনা পাঁচটি কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম নিয়ে জাহাজটি সরাসরি টার্মিনালে নোঙর করে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের আশা, নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ধরে রাখা গেলে এ ধরনের মাদার ভেসেল বা বড় পণ্যবাহী জাহাজ ভবিষ্যতে সরাসরি টার্মিনালে ভিড়তে পারবে।

বন্দর সচল করতে নতুন বিনিয়োগের পক্ষে অর্থনীতিবিদ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিফাত ফেরদৌস মনে করেন, পায়রা বন্দর যেহেতু ইতোমধ্যে একটি পর্যায়ে এসেছে, তাই সেটিকে সচল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, “পায়রা বন্দর যেহেতু একটি পর্যায়ে এসেছে এখন সেটিকে চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রতিষ্ঠানটি তো এখন বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব না। যদি এডিশনাল বিনিয়োগ দরকার হয় অন্তত সেটি করে হলেও সচল করার পরে এর আয়-ব্যয়ের পর্যালোচনা করা সম্ভব।”

এই অর্থনীতিবিদের মতে, দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অনেকগুলোই ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত হয়। প্রকল্প শেষ হলেই ঋণ পরিশোধের দায় শেষ হয়ে যায় না; সেই দায় শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়।

তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রতিষ্ঠানটি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা না গেলে ঋণের বোঝা আরও বাড়তে থাকবে। তাই একদিকে বন্দর সচল রাখার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে, অন্যদিকে প্রতিটি কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অনিয়ম বা প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি না হয়।

আগের ড্রেজিংয়ের সুফল যাচাইয়ের তাগিদ

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সভাপতি অধ্যাপক গাজী জাহিদ হোসেন মনে করেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে আগের ড্রেজিংয়ের কার্যকারিতা ও সুফল মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “পায়রা বন্দরে চ্যানেলের নাব্য সংকট বহুল আলোচ্য বিষয়। এর আগেও বিপুল অর্থ ব্যয় করে ড্রেজিং হয়েছে। সেটির কী উপকারিতা এসেছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। আগের কাজের পর্যালোচনা না করে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় টাকার শ্রাদ্ধ করার কোনো মানে হয় না।”

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পর নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া উচিত। তা না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পায়রা বন্দর সচল রাখতে ধারাবাহিক কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

অধ্যাপক গাজী জাহিদ হোসেনের মতে, দুই-তিন বছর পরপর বিপুল অর্থ ব্যয়ে ড্রেজিংয়ের পরিবর্তে প্রতি বছর নিয়মিত ড্রেজিং চালু রাখা হলে চ্যানেলের নাব্যতা বজায় রাখা এবং বন্দরকে ব্যবহারযোগ্য রাখার ক্ষেত্রে তা বেশি কার্যকর হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি ড্রেজিং ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ-উল ইসলাম মনে করেন, রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং সম্পন্ন হলে বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়বে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে ড্রেজিং শুরু হলে অতিরিক্ত চার মিটার গভীরতার মধ্যে কয়লাবাহী মাদার ভেসেলের পাশাপাশি গাড়িবাহী জাহাজ, খাদ্য, সার ও নির্মাণসামগ্রীবাহী জাহাজ প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে নাব্যতা নিয়ে একই ধরনের সংকট বারবার সৃষ্টি না হয়, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বড় জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভেড়ানোর সুযোগ বাড়তে পারে। তবে প্রকল্পের অনুমোদন, বাস্তবায়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করার বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত এর কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ

পায়রা বন্দরকে সচল করতে নতুন করে ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ড্রেজিং প্রকল্পের উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন আগের ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পরও নাব্যতা সংকট ফিরে এসেছে এবং বড় জাহাজের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

একদিকে বন্দর সচল রাখতে চ্যানেলের গভীরতা বাড়ানো জরুরি, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আগের ড্রেজিংয়ের ফলাফল মূল্যায়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, ব্যয়-সুফলের হিসাব এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পায়রা বন্দর কার্যকরভাবে চালু করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের পণ্য পরিবহন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, দীর্ঘমেয়াদে বন্দরকে সচল রাখার কার্যকর ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন