কক্সবাজার-কুয়াকাটার সৈকত, সাজেকের মেঘঢাকা পাহাড় ও কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের ঢল; হোটেল-রিসোর্টে বেড়েছে বুকিং, জমজমাট পর্যটননির্ভর ব্যবসা
শারদীয় দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত, খাগড়াছড়ি ও সাজেকের পাহাড়ি এলাকা এবং রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে অবকাশ কাটাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে দর্শনীয় স্থানগুলো মুখর হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে পর্যটননির্ভর এলাকার হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ছুটির এই সময়ে পর্যটকদের আনাগোনা তাঁদের ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সমুদ্রস্নান, নৌভ্রমণ, পাহাড়ি পথে ঘোরাঘুরি ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য উপভোগ করছেন পর্যটকেরা। সব মিলিয়ে দুর্গাপূজার ছুটি দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
কক্সবাজারে পর্যটকদের ঢল
দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারে এখন উৎসবের আমেজ। নীল সমুদ্র, বিস্তৃত বালুকাবেলা ও ঢেউয়ের গর্জন উপভোগ করতে প্রতিদিনই আসছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রস্নানে ব্যস্ত, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ সৈকতে বসে উপভোগ করছেন সমুদ্রের নোনা বাতাস।
পর্যটকদের আগমনে শহরের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে ব্যস্ততা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পূজার ছুটিতে কক্সবাজারে কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক হোটেলে কক্ষের অগ্রিম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বাসসকে বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় রাখা হচ্ছে।
কুয়াকাটায় সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখার আকর্ষণ
দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাতেও বেড়েছে পর্যটকদের আনাগোনা। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা নিতে সেখানে যাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতে হাঁটাহাঁটি, সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ, স্থানীয় খাবারের স্বাদ গ্রহণ এবং বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে সময় কাটিয়ে ছুটি উপভোগ করছেন তাঁরা। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ব্যস্ততা বেড়েছে।
খাগড়াছড়ি ও সাজেকে পাহাড়-ঝরনার টান
সমুদ্রের পাশাপাশি পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে ছুটির আনন্দ। খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা ও মায়াবিনী লেকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পর্যটকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ি পথ, ঝরনার জলধারা ও সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে নগরজীবনের ব্যস্ততা ভুলে সময় কাটাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের আগ্রহ বাড়ছে জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইংয়ের মতো বিনোদনমূলক কার্যক্রমেও। অন্যদিকে মেঘে ঢাকা পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য পরিচিত সাজেক ভ্যালিও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজ মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ আবাসনকেন্দ্রে আগাম বুকিং বেড়েছে। পর্যটকদের এই উপস্থিতিতে স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকান ও অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কাপ্তাই হ্রদ ও ঝুলন্ত সেতুতে রাঙামাটির সৌন্দর্য উপভোগ
পাহাড়, সবুজ অরণ্য ও কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশির মেলবন্ধনে অনন্য রাঙামাটিতেও পর্যটকদের পদচারণায় প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে। জেলা শহরের অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুতে সকাল থেকেই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পাহাড় ও হ্রদের দৃশ্য উপভোগ করছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছবি তুলছেন।
অনেকে ভাড়া করা পর্যটকবাহী নৌযানে কাপ্তাই হ্রদ ঘুরে দেখছেন। হ্রদের জলরাশি পেরিয়ে সুবলং ঝরনার দিকে যাত্রাও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বাড়তি পর্যটকের চাপে শহরের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতেও ব্যস্ততা বেড়েছে।
রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, দুর্গাপূজার ছুটিকে ঘিরে তাঁদের আবাসনকেন্দ্রের কক্ষগুলোর চাহিদা বেড়েছে। পর্যটকদের আগমন অব্যাহত থাকায় সামনের দিনগুলোতেও ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
জামালপুর থেকে পরিবার নিয়ে রাঙামাটি বেড়াতে আসা শিক্ষক মো. হানিফ বলেন, পাহাড় ও কাপ্তাই হ্রদের অপূর্ব সৌন্দর্য তাঁদের মুগ্ধ করেছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আরও আধুনিকায়ন করা গেলে সারা বছরই এখানে পর্যটকদের আগমন বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ঝুলন্ত সেতুর টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা মো. ইউসুফ বলেন, পূজার ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কমপ্লেক্সের আবাসনে থাকা অতিথিদের পাশাপাশি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী ঝুলন্ত সেতু দেখতে আসছেন। অনেকে নৌযান ভাড়া করে কাপ্তাই হ্রদেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় জোরদার ব্যবস্থা
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব বাসসকে বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন ও পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সমন্বয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পর্যটকেরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, পর্যটকবাহী জিপ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের চাপ বেড়েছে।
পর্যটননির্ভর এসব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় পরিবার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি জনপদগুলোতে পর্যটন মৌসুম অনেক মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ, সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি করছে এই ভ্রমণ। সমুদ্রের গর্জন, পাহাড়ের নীরবতা, ঝরনার কলতান কিংবা হ্রদের বুকে নৌভ্রমণ—প্রতিটি অভিজ্ঞতা ছুটিকে দিচ্ছে ভিন্ন মাত্রা।
দুর্গাপূজার এই দীর্ঘ ছুটি একদিকে পর্যটকদের অবকাশযাপনের আনন্দ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে তৈরি করেছে নতুন আশাবাদ।

