বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

প্রকল্প ও বাজেট সহায়তায় বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার চাইল সরকার

চলতি অর্থবছরে প্রকল্প ও বাজেট সহায়তার পাশাপাশি প্রস্তাবিত আরআরআইপি কাঠামোয় বড় অঙ্কের ঋণ চায় সরকার; অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

দেশের আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অর্থায়ন ও অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত প্রকল্প বরাদ্দের বাইরে আগামী তিন বছরে আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা চেয়েছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থ এলএনজি আমদানি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বড় পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন কীভাবে আসবে, এর উৎস ও শর্ত কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব

‘রেজিলিয়েন্স, রিফর্ম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’ (আরআরআইপি) নামের একটি প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ।

গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রথম এই ১০ বিলিয়ন ডলারের কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

পরে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে সম্ভাব্য চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সম্মেলন শেষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অংশীদারত্ব চূড়ান্ত করতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

বার্ষিক সম্মেলনে ১২ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি বলেন, “এই ঋণের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আগামীতেও আলোচনা হবে।”

১০ বিলিয়ন ডলার যেসব খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা

আরআরআইপি কাঠামোর অধীনে আগামী তিন বছরে চাওয়া অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার চারটি প্রধান খাতে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে সরকার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জ্বালানি তেল ও সারসহ জরুরি আমদানির অর্থায়নে ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ (এমএসএমই) উদ্যোক্তাদের বাণিজ্য সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আর্থিক খাতের পুনরুদ্ধারে ৩ বিলিয়ন ডলার এবং জরুরি প্রয়োজন ও যৌথ অর্থায়নের জন্য বাকি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পরবর্তী ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিপিএফ)-এ আরআরআইপি কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে ১০ প্রকল্পে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের জন্য পাইপলাইনে থাকা ১০টি প্রকল্প নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে আনুষ্ঠানিক সূত্র। এসব প্রকল্পের জন্য মোট ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সুযোগ তৈরি করতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) গ্যারান্টি হিসেবে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে সরকার।

ব্যাংকিংসহ আর্থিক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রাম-২’-এর আওতায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি সহায়তা প্রকল্পের জন্য আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে।

তিন বড় পরিবহন প্রকল্পে নজর

সরকার বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে তিনটি অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্পে। এগুলো হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোর স্থাপন, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং ঢাকা ইনার সার্কুলার রিং রোড।

এ ছাড়া ঢাকার চারপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট’ (ইউআইপি) বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, বিশ্বব্যাংকের তিন বছর মেয়াদি আইডিএ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের বার্ষিক বরাদ্দ আগে কখনোই ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি।

তাঁর মতে, আরআরআইপির অধীনে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য অনিয়মিত অর্থায়ন চ্যানেল থেকে আসতে হতে পারে।

তিনি বলেন, “ঋণের প্রধান উৎস, অর্থের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ কিংবা এর সঙ্গে কী কী শর্ত যুক্ত হতে পারে—তা এখনই নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি।”

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোর ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্পে অর্থায়ন নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর নকশা প্রণয়ন এবং সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।

ঋণের ব্যবহার নিয়ে সতর্কতা

বৈদেশিক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের জরুরি অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর মতো প্রয়োজনীয় রাজস্ব ও আর্থিক সক্ষমতা সরকারের হাতে নেই।

তবে জাতীয় ঋণের বোঝা যেন অতিরিক্ত না বাড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, “বিদ্যমান ঋণের ওপর নতুন করে বাড়তি চাপ এড়াতে স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে এবং অত্যন্ত স্বচ্ছ ও দক্ষতার সঙ্গে এই অর্থ ব্যয় করতে হবে।”

আইএমএফের সঙ্গেও ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা

ব্যাংককে অবস্থানকালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।

আইএমএফ বিশেষভাবে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি দূর করার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে অবিলম্বে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।

অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, আইএমএফের ঋণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত বা ‘পারফরম্যান্স ক্রাইটেরিয়া’ বহাল থাকবে। তিনি বলেন, “আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কিছু সমস্যা সমাধান করা হবে।”

পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আইএমএফের একটি কারিগরি দল ঢাকায় আসবে বলেও জানান তিনি।

আইএফসি ও বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক

বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশনের (আইএফসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। সেখানে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার, পুনর্মূলধনীকরণ, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন বৈশ্বিক ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে ব্যাংকিং সংস্কার, বিনিময় হারের নমনীয়তা এবং মুদ্রানীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গ্যালির নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল ইউরোক্লিয়ার, সিটি ব্যাংক, ফিচ রেটিংস, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক, এইচএসবিসি, টিসিএক্স, ক্লিয়ারস্ট্রিম ব্যাংকিং, ব্যাংক অব আমেরিকা, জেপি মরগান ও গুগলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেয়।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং, সভরেন বন্ড ইস্যু, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন