আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, মৌসুমের আগেই বাজারে সবজি তুলে ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা
দিনাজপুরে আগাম জাতের শীতকালীন সবজি চাষ ও ফসল পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত পরিচর্যা এবং জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে আগাম সবজি উৎপাদনে ঝুঁকছেন তাঁরা। মৌসুমের শুরুতেই এসব সবজি বাজারজাত করে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন কৃষকেরা।
জেলার সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো, মুলা, শিম ও শসার চাষ হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু আগাম সবজি বাজারে উঠতে শুরু করেছে এবং ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান বুধবার বাসসকে বলেন, দিনাজপুরকে দেশের শস্যভাণ্ডার বলা হয়। জেলার সব উপজেলাতেই বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপাদিত হয়। চলতি বছর কৃষকেরা আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মৌসুমের আগেই বাজারে তোলার প্রস্তুতি
কৃষি কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান বলেন, সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে শীতকালীন সবজি বাজারে আসে। ওই সময়ে সরবরাহ বেশি থাকায় কৃষকেরা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য দাম পান না। তবে বর্ষার শেষ দিকে, কার্তিক মাসের শুরু থেকে বাজারে আগাম সবজির চাহিদা ও দাম তুলনামূলক বেশি থাকে।
এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কৃষকেরা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই সবজি চাষের উপযোগী উঁচু জমি প্রস্তুত করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। আগাম সবজি বাজারজাত করতে পারলে তাঁরা বেশি লাভবান হবেন বলে আশা করছেন।
সরেজমিনে দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর কর্ণাই, গোলাপগঞ্জ, সুন্দরবন, ফাজিলপুর ও আউলিয়াপুর গ্রামের সবজিক্ষেত ঘুরে কৃষকদের ব্যস্ততার চিত্র দেখা গেছে।
বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বিশেষ ব্যবস্থা
সদর উপজেলার কর্ণাই গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৪২) চলতি বছর তাঁর ৬০ শতক জমিতে তিন ভাগে আগাম জাতের বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁঠালি বেগুন ও টমেটো।
রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষে আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি থেকে তিনি সবজি চাষ শুরু করেছেন। এখন ক্ষেতের গাছগুলো অনেকটা বেড়ে উঠেছে। তবে অসময়ে বৃষ্টির আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে জমিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রতি তিন ফুট পরপর নালা তৈরি করেছেন।
তিনি বলেন, এতে বৃষ্টির পানি সহজেই ক্ষেত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমেছে। ফসল রক্ষায় নিয়মিত পরিচর্যাও করছেন তিনি।
রফিকুল ইসলাম আশা করছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তাঁর ক্ষেতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো ও মুলা বাজারজাত করতে পারবেন। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে সবজি বিক্রি করতে পারলে ভালো দাম পাবেন বলে তাঁর প্রত্যাশা।
আধুনিক পদ্ধতিতে কমছে খরচ
সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক (৪৮) বলেন, কয়েক বছর ধরে তাঁরা কয়েকজন কৃষক আগাম জাতের শীতকালীন সবজি চাষ করছেন। এ পদ্ধতিতে চাষ করে তাঁরা লাভবান হয়েছেন।
তিনি বলেন, আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে তাঁদের পরিশ্রম ও উৎপাদন খরচ—দুটিই কমেছে। এবারও কয়েক ধরনের সবজি চাষ করেছেন তিনি। মৌসুমের আগেই সবজি বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন।
৩২ শতক জমিতে ফুলকপি, খরচ ২৫ হাজার টাকা
ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর গ্রামের কৃষক সহিদ মিয়া (৩৮) এবার ৩২ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ২১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বাজারজাত করা পর্যন্ত মোট খরচ প্রায় ২৫ হাজার টাকা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সহিদ মিয়া আশা করছেন, আট থেকে ১০ দিনের মধ্যে তাঁর ক্ষেতের ফুলকপি বাজারে তুলতে পারবেন।
তিনি বলেন, গত বছর একই জমিতে উৎপাদিত ফুলকপি বিক্রি করে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। এবারও ভালো ফলনের আশা করছেন। ফুলকপির পাশাপাশি শিম ও শসার চাষ করেছেন তিনি। এ বছর সবজির ফলন ভালো হওয়ায় গত বছরের তুলনায় বেশি লাভের প্রত্যাশা করছেন।
কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বাসসকে বলেন, আগাম জাতের সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক এ পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এ অঞ্চলে উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।
তিনি জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং রোগবালাই দমনে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বাসসকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলায় ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর।
এ ছাড়া চলতি বছর জেলায় ৩৬ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আফজাল হোসেন বলেন, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কৃষকেরা সবজি চাষসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছেন।

