দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তোর প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ধোঁয়াশায় বিপর্যস্ত জনজীবন
ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার অভিযোগে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। রাজধানী জাকার্তাসহ জাভা, সুমাত্রা ও সুলাওয়েসি দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তোর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আন্দোলনকারীরা।
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে দাবানল নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চলা আগুন ও ধোঁয়াশার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ
জাকার্তা ছাড়াও বান্দুং, ইয়োগিয়াকার্তা, পেকানবারু ও মাকাসারে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের অযোগ্যতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তাঁদের অনেকে বিশেষ করে জুলাই থেকে বোর্নিও ও সুমাত্রার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন।
জাকার্তায় এক বিক্ষোভকারীর হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা পুড়লে, তোমরাও আমাদের সঙ্গে পুড়বে!’ আরেকজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমার শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে। অবিলম্বে আগুন নিভিয়ে ফেলুন।’
ইয়োগিয়াকার্তায় আঞ্চলিক আইন পরিষদ ভবনের সিঁড়িতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনাও ঘটে।
ধোঁয়াশায় বিপর্যস্ত জনজীবন
বোর্নিও দ্বীপের পালাংকারায়া শহরের বাসিন্দারা দাবানলের কারণে সৃষ্ট ধোঁয়াশায় দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ৪০ বছর বয়সী রাস্তার পাশের পানীয় বিক্রেতা মেলসি বলেন, ধোঁয়াশার কারণে ক্রেতা কমে গেছে, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মেলসি বলেন, সাধারণ মানুষ হিসেবে তাঁদের করার তেমন কিছু নেই; পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ওপরই তাঁরা নির্ভর করছেন।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে দূষিত বাতাস
দাবানলের ধোঁয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ২৯ বছর বয়সী গৃহিণী সিফরা বলেন, তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান এক মাস ধরে কাশিতে ভুগছেন। ঘরের ভেতরেও ধোঁয়া প্রবেশ করছে বলে জানান তিনি।
সিফরার ভাষ্য, ধোঁয়াশা শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁর শরীর ব্যথা করছে এবং সহজেই সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের আরও জোরালো পদক্ষেপ দাবি করেন।
সোমবার পালাংকারায়ায় কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী দাবানল পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানান।
গ্রিনপিসের কর্মীদের আটক
মঙ্গলবার জাকার্তার কেন্দ্রীয় বুন্দারান এইচআই গোলচত্বরের একটি স্মৃতিস্তম্ভে গ্রিনপিসের প্রতিবাদী ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগে ছয় কর্মীকে আটক করে পুলিশ। সংস্থাটির প্রচারকর্মী জেনি সিরাইত জানান, শিক্ষার্থীদের মিছিল শুরুর আগে সকালে এ ঘটনা ঘটে।
ব্যানারগুলোর একটিতে লেখা ছিল, ‘ধোঁয়াশা ও প্রাবোবোর শাসন = জাতীয় দুর্যোগ।’ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় বার্ষিকী ঘিরে আয়োজিত বিক্ষোভে আন্দোলনকারীরা প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তিন আঙুলের স্যালুটও প্রদর্শন করেন।
দাবানল মোকাবিলায় ৬০ হাজারের বেশি কর্মী
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থার মুখপাত্র বার্টন পাঞ্জাইতান জানান, দেশজুড়ে দাবানল নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবকসহ ৬০ হাজারের বেশি দমকলকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
বৃষ্টিপাত ঘটানোর লক্ষ্যে ওয়াটার বোম্বিং ও ক্লাউড সিডিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৩৯টি বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তবে ঘন ধোঁয়াশার কারণে মাঝেমধ্যে এসব বিমানের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।
দাবানল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসানতারা অ্যাটলাসের সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় দিনেই ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও দূষণের প্রভাব
ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়া দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরের মতো দূরবর্তী শহরেও বায়ুদূষণ বাড়িয়েছে। এতে দাবানল পরিস্থিতি আঞ্চলিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় প্রতি শুষ্ক মৌসুমেই দাবানলের ঘটনা ঘটে। তবে চলতি বছরের আগুনকে বিশেষভাবে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পেছনে এল নিনোর অত্যন্ত তীব্র একটি পর্ব আংশিকভাবে দায়ী বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

