১০ বছরের পরিশ্রমে গড়া প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, ভাড়া-বিল ও কর্মীদের বেতন নিয়ে দুশ্চিন্তা
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সাম্প্রতিক দাঙ্গায় ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হাসান। ১০ বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা দোকানটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিন সন্তানের এই বাবা। দোকানের মালামাল লুট হওয়ার পাশাপাশি এখনো তাকে ভাড়া, বিভিন্ন বিল ও কর্মীদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে।
হাসান বলেন, “১০ বছরের পরিশ্রম ধ্বংস হয়ে গেছে, তিন দিন ধরে ঘুমাইনি।”
ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে যান হাসান। কয়েক বছর বিভিন্ন কাজ করার পর অর্থ সঞ্চয় করে এক সহযোগীর সঙ্গে ২০১৬ সালে দোকানটি চালু করেন। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিকের কাছে একটি প্রধান সড়কে অবস্থিত দোকানটিতে প্রযুক্তিপণ্য বিক্রির পাশাপাশি কুরিয়ার সেবাও দেওয়া হতো।
দাঙ্গাকারীদের হুমকিতে দোকান ছাড়তে বাধ্য
হাসান জানান, দাঙ্গাকারীরা তার ওপর হামলা চালায় এবং মাথায় মদের বোতল ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে দোকান ছেড়ে চলে যেতে হয়।
তিনি বলেন, “প্রায় ১০ বছর ধরে আমরা ধীরে ধীরে, একটু একটু করে এই দোকানটি গড়ে তুলেছিলাম।” দোকানের কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “একসময় এটি ছিল আমার কর্মস্থল, কিন্তু এখন এখানে আর কিছুই নেই। এসব ঘটার পর থেকে আমি আর ঘুমাতে পারছি না।”
বিমা মূল্যায়নের অপেক্ষায় থাকায় এখনো দোকানের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে পারছেন না হাসান। মেঝেতে পড়ে আছে ভাঙা মোবাইল ফোন, খালি পার্সেল ও কাচের টুকরা। দোকানের মালামাল লুট হওয়ার পরও নিয়মিত খরচ মেটানোর চাপ তাকে সামলাতে হচ্ছে।
ক্যামেরায় লুটপাট দেখে স্তব্ধ
গত ১৭ অক্টোবর প্যারিসের যেসব এলাকায় সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার দোকানটি সেগুলোর একটিতে অবস্থিত। ফরাসি কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী শনিবার বিকেলে দোকান বন্ধ করে দেন হাসান। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর মোবাইল ফোনে নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্য দেখতে গিয়ে তিনি দোকানের ভেতরে লুটপাটকারীদের দেখতে পান।
হাসান বলেন, “ক্যামেরায় আমি দোকানের ভেতরে প্রায় ৩০ জনকে দেখলাম। ভাবছিলাম এটা কীভাবে সম্ভব?”
তিনি দ্রুত দোকানে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তবে সহিংসতা চলতে থাকায় পুলিশ প্রথমে তাকে দোকানের আশপাশের নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। পরে তিনি পুলিশকে বারবার অনুরোধ করেন এবং মোবাইল ফোনে দোকান ধ্বংসের দৃশ্য দেখালে সেখানে যাওয়ার অনুমতি পান।
কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি বুঝতে পারেন, তখন আর কিছু করার নেই। সেখানে কোনো পুলিশ সদস্যকেও দেখতে পাননি বলে জানান তিনি।
ইউরোনিউজের হাতে আসা আরেকটি ভিডিওতে লুটপাটকারীদের পাশের আবাসিক ভবনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। দোকানটির একটি প্রবেশপথ ওই ভবনে অবস্থিত। প্রতিবেশীরা লুটপাটকারীদের থামতে অনুরোধ করলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকায় তাদের বাধা দিতে পারেননি।
হাসানের ভাষ্য, অল্পবয়সী কয়েকটি ছেলে-মেয়ের দল দোকানটিতে হামলা চালায়। তাদের কারও কারও বয়স ১৫ বছরের মতো মনে হচ্ছিল। একদল লুটপাট শেষ করে চলে গেলে আরেক দল আসছিল। এভাবে একের পর এক দল দোকানে ঢোকে।
লুটপাটকারীরা মোবাইল ফোন, প্রযুক্তিপণ্য ও পার্সেল নিয়ে যায়। কয়েকজন বাইরে দাঁড়িয়ে ভাঙা কাচের ফাঁক দিয়ে ভেতর থেকে মালপত্র অন্যদের হাতে তুলে দিচ্ছিল। দোকানের বেসমেন্টে মালামাল রাখার ঘরটিও লুট করা হয়।
অন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
স্থানীয় এক কুরিয়ারকর্মী ইউরোনিউজকে জানান, চুরি যাওয়া অনেক পার্সেল তিনি নিজেই সরবরাহ করেছিলেন। তবে তার দেখা কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু জীবিকা নির্বাহ করতে ও সততার সঙ্গে নিজেদের কাজ করতে চাই। অন্যরা সবকিছু ধ্বংস করতে চায়।”
হাসানের দোকানের বিপরীতে ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ সুপারমার্কেট চেইন ইন্টারমার্শের একটি শাখা রয়েছে। লুটপাটের পর থেকে সেটিও বন্ধ। কর্মীরা কয়েক দিন ধরে দোকান পরিষ্কার, কাচের টুকরা অপসারণ এবং তাকগুলোতে নতুন করে পণ্য সাজানোর কাজ করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কট্টর বামপন্থী দলের কিছু কর্মী ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়েছেন। তবে বড় সুপারমার্কেট ও কোম্পানিতে লুটপাটের বিষয়ে তাদের তুলনামূলক সহনশীল মনোভাবের কথা উঠে এসেছে। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাদের প্রতীক।
হাসানকে সহায়তায় অনলাইনে অর্থ সংগ্রহ
লুটপাটের পর হাসানকে সহায়তা করতে স্থানীয় কর্মী নোয়াম অনলাইনে অর্থ সংগ্রহের একটি পেজ খুলেছেন। সেখানে ইতোমধ্যে হাজার হাজার অর্থ অনুদান হিসেবে জমা পড়েছে।
নোয়াম বলেন, “হাসানকে আমরা চিনি। তিনি নিয়মিত আমাদের বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ ও অন্যান্য কাজে সহায়তা করেন। তার সঙ্গে কাজ করতে আমরা অভ্যস্ত। যতটা সম্ভব তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি, কারণ অনেক কাজ বাকি রয়েছে। আমরা সবাই মিলে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে চাই।”
বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তা
ফ্রান্সের স্কুলগুলোতে পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের টানা চার সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস দাঙ্গায় রূপ নেয়। বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের বড় অংশ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করলেও লুটপাটকারীরা ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে বিক্ষোভের মূল চিত্র আড়ালে পড়ে যায়।
দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোকে সহায়তা দিতে ফরাসি সরকার জরুরি আর্থিক সহায়তা ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি চালু করেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো মঙ্গলবার থেকে কর্মীদের জন্য সরকারের অর্থায়নে ‘অ্যাক্টিভিতে পারতিয়েল’ বা আংশিক কর্মবিরতি কর্মসূচি চালু করতে পারবে।
এদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করেছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাবার বুলেট নিক্ষেপকারী অস্ত্র, যা ফ্রান্সে ‘এলবিডি’ নামে পরিচিত, এবং স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের সমালোচনা করেছে তারা। সমালোচকদের দাবি, এসব অস্ত্র ব্যবহারে বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন।
গত শনিবার দেশটিতে ট্রেড ইউনিয়ন, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কর্মী ও শিক্ষার্থীরা বড় পরিসরে বিক্ষোভে অংশ নেন। অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করলেও দাঙ্গাকারীদের লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে সহিংস করে তোলে।
এরপর ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। ২৪ অক্টোবরের আসন্ন বিক্ষোভ সামনে রেখে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ঘোষণাও দিয়েছে সরকার।

