কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হয় প্রসাধনী, গাড়ির যন্ত্রাংশ, নাট-বল্টু ও বিয়ারিং; একাধিক চালানে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা
চট্টগ্রাম বন্দরে কম শুল্কের পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কের প্রসাধনী, গাড়ির যন্ত্রাংশ, নাট-বল্টু, বিয়ারিংসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির আটটি ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
শনিবার এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সিআইসি ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অ্যান্টি-ইলিসিট ট্রেড (এআইআর) শাখার যৌথ অভিযানে সন্দেহজনক কন্টেইনারগুলো কায়িক পরীক্ষা করে এসব অনিয়ম উদ্ঘাটন করা হয়।
এ ঘটনায় কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণায় উচ্চ শুল্কের পণ্য
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, টুথপিক, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার, রবার বুশ এবং স্টেইনলেস স্টিল সার্কেলের মতো পণ্যের ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানি করা হয়।
কায়িক পরীক্ষায় এসব চালানে নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, নিষিদ্ধ ক্রিম, লেজার লাইট, গাড়ির ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, বিয়ারিং, নাট-বল্টু, স্ক্রু ও পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার পাওয়া যায়। কোনো কোনো চালানে ঘোষিত পণ্যের তুলনায় প্রকৃত পণ্যের পরিমাণেও বড় ধরনের অসংগতি দেখা গেছে।
পাওয়ার স্প্রেয়ারের ঘোষণায় প্রসাধনী, রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা আড়াই কোটি টাকা
ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আমদানির ঘোষণা দেয়। তবে কন্টেইনার কায়িক পরীক্ষার সময় ঘোষিত পণ্যের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের অঘোষিত পণ্য পাওয়া যায়।
এসব পণ্যের মধ্যে ছিল স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, এলইডি লাইট, সানগ্লাস ও কালো চুলের শ্যাম্পু। এ চালানে ঘোষিত ওজনের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি অতিরিক্ত পণ্যও পাওয়া যায়।
এনবিআরের হিসাবে, এ চালানে আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল।
টুথপিকের চালানে নিষিদ্ধ ক্রিম, ফাঁকির চেষ্টা ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা
পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার কাফ করপোরেশন চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু কন্টেইনার খুলে পরীক্ষার পর মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি টুথপিক পাওয়া যায়।
বাকি পণ্যের মধ্যে পাকিস্তানের গোরি বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, সানগ্লাস ও ডিলে স্প্রে পাওয়া যায়। এসব পণ্যের মাধ্যমে আনুমানিক ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে এনবিআর।
গাড়ির যন্ত্রাংশের চালানে অনিয়ম, ফাঁকির চেষ্টা ৪৪ লাখ টাকা
ঢাকার এইচ.আর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে ১৬ হাজার ৪০ কেজি ইঞ্জিন রবার বুশ আমদানির ঘোষণা দেয়। তবে কায়িক পরীক্ষায় প্রকৃত রবার বুশ পাওয়া যায় মাত্র ৬ হাজার ৬২৫ কেজি।
বাকি পণ্যের মধ্যে ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। এ চালানে আনুমানিক ৪৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য জানিয়েছে এনবিআর।
হিট ট্রান্সফার পেপারের বদলে পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার
নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স চীন থেকে ২৩ হাজার ৬১৮ কেজি হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কন্টেইনার পরীক্ষা করে মাত্র ৩ হাজার ১৬০ কেজি হিট ট্রান্সফার পেপার পাওয়া যায়।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চালানটিতে ঘোষিত পণ্যের পরিবর্তে প্রায় ২১ হাজার ৪৬৭ কেজি উচ্চ শুল্কের পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার পাওয়া যায়। এ ঘটনায় আনুমানিক ৪০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল।
নাট-বল্টু ও বিয়ারিং আমদানিতেও অনিয়ম
বংশালের নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ এবং ওয়ারীর মোহাম্মাদীয়া ট্রেডের চালানেও অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
মোহাম্মাদীয়া ট্রেড ২২ টন স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল ও এক্সকাভেটর গিয়ার আমদানির ঘোষণা দিলেও কায়িক পরীক্ষায় মাত্র ৩ দশমিক ৮ টন ঘোষিত পণ্য পাওয়া যায়। কন্টেইনারে অতিরিক্তভাবে ২২ হাজার ১১৩ কেজি নাট, বল্টু ও স্ক্রু পাওয়া যায়। এ চালানে আনুমানিক ৩২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের চালানে ১৭ হাজার ৫৯২ কেজি নাট-বল্টু, ২ হাজার ৭৮৭ কেজি ভারী রোলিং বিয়ারিং এবং ২ হাজার ৩৩৬ কেজি রিভলভিং চেয়ারের গ্যাস লিফট সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এ ঘটনায় আনুমানিক ৪২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য জানিয়েছে এনবিআর।
কন্টেইনারের সিল বদল ও নথি জালিয়াতির অভিযোগ
শুল্ক ফাঁকির পাশাপাশি কাস্টমসের নজরদারিতে থাকা কাফ করপোরেশনের আরেকটি কন্টেইনার অবৈধভাবে সরানোর চেষ্টার তথ্যও উদ্ঘাটিত হয়েছে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কন্টেইনারটি এএসওয়াইসিইউডিএ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক করা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত কায়িক পরীক্ষার তারিখের আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সেটি কিপ ডাউন করা হয়। এ সময় বিল অব লেডিংয়ে উল্লেখ করা মূল সিল ভেঙে অন্য একটি সিল লাগানো হয়।
নথিপত্র যাচাই করে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। পরে কন্টেইনারটি নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে জব্দ করা হয়।
শুল্ক ফাঁকি রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার ঘোষণা
এনবিআর জানিয়েছে, ডিজিটাল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব অনিয়ম ও জালিয়াতি উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সুরক্ষা, দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষা এবং শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

