৩৩৮টি এজেন্সি পেল নিয়োগ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ; কলিং ভিসা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিএমইটি ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া নির্ধারণ
দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময়ের অনিশ্চয়তার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় ৩৩৮টি বাংলাদেশি এজেন্সি কর্মী নিয়োগ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
সরকারের দাবি, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী নিয়োগের নির্দিষ্ট সময়সূচি, কর্মী বাছাইয়ের মানদণ্ড এবং সব শ্রেণির কর্মীর জন্য অভিবাসন ব্যয়ের বিস্তারিত কাঠামো এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
দুই বছরের বেশি সময় পর নতুন উদ্যোগ
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের গন্তব্য মালয়েশিয়া। দেশটির নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা ও অন্যান্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করে আসছেন।
তবে ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। এর আগে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পৌঁছাতে না পারার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
শেষ মুহূর্তে অনেক কর্মী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বিমান টিকিট সংগ্রহ করতে না পেরে বিদেশযাত্রার সুযোগ হারান। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন বহু বিদেশগমনেচ্ছু কর্মী।
পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও দীর্ঘদিন কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
সরকারের নতুন ঘোষণায় সেই অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৩৩৮টি এজেন্সি যেভাবে কাজ করবে
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)।
- ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি।
- আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি।
তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে কর্মীর চাহিদাপত্র সংগ্রহ করতে পারবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে কর্মী নির্বাচন এবং নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে বোয়েসেল ও ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সহায়তা করবে।
যেভাবে সম্পন্ন হবে কর্মী নিয়োগ
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় নতুন ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তুলে ধরেছে।
প্রথম ধাপ: নিয়োগকর্তা ও চাহিদাপত্র সংগ্রহ
মালয়েশিয়ার অনুমোদিত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সংগ্রহ করবে।
দ্বিতীয় ধাপ: কর্মী নির্বাচন
চাহিদাপত্র সংগ্রহকারী এজেন্সি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী নির্বাচন করবে।
তৃতীয় ধাপ: ভিসা প্রক্রিয়াকরণ
মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে বোয়েসেল ও তালিকাভুক্ত প্রসেসিং এজেন্সিগুলো সহায়তা করবে।
চতুর্থ ধাপ: বিএমইটি ছাড়পত্র
মালয়েশিয়ার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে কর্মীর বহির্গমন ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে পারবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী প্রসেসিং এজেন্সি অনাপত্তিপত্র বা এনওসি প্রদান করবে।
এরপর আইনগত ও প্রশাসনিক সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কর্মীর বিদেশযাত্রার ব্যবস্থা করা হবে।
১০ হাজার কর্মীর জন্য বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ
নতুন ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে মালয়েশিয়ার নীতিগত সম্মতি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে এই ১০ হাজার কর্মী কোন কোন খাতে নিয়োগ পাবেন, তাঁদের যোগ্যতা কী হবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং কবে থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এ কারণে নীতিগত সম্মতিকে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ হাজার কর্মীর চূড়ান্ত চাকরি বা ভিসা অনুমোদন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নতুন ব্যবস্থা
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
বিদ্যমান সমঝোতা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য পরীক্ষার কেন্দ্র অনুমোদনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া যৌথভাবে কাজ করবে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল বাংলাদেশ সফর করে মেডিকেল সেন্টারগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করবে।
পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাইয়ের পর নতুন তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
তবে শ্রমবাজার চালুতে বিলম্ব এড়াতে মালয়েশিয়ার বিদ্যমান অনুমোদিত তালিকার গ্রহণযোগ্য মেডিকেল সেন্টারগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কোনো একটি মেডিকেল সেন্টারকে একচেটিয়াভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
৪২৩ এজেন্সির তালিকা থেকে নতুন কাঠামো
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির যোগ্যতা নির্ধারণ ও তালিকাভুক্ত করার দায়িত্ব মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
দুই দেশের ধারাবাহিক আলোচনার পর নতুন ব্যবস্থায় মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সম্মতি পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে গুরুত্ব পায় শ্রমবাজার
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেয়।
এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেন।
সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ পুনরায় চালু এবং শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনা করেন তিনি।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আলোচনাকে নতুন অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসন ব্যয় ও স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ঘোষণাকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও নতুন ব্যবস্থায় কর্মীদের প্রকৃত অভিবাসন ব্যয় কত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশেষ করে ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সির ভূমিকা এবং অন্যান্য রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে তাদের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
আগের নিয়োগব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং বিদেশযাত্রায় অনিশ্চয়তার অভিযোগ ওঠায় নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বৈধ এজেন্সির অংশগ্রহণ বাড়ানো, কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশগমনেচ্ছু কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মৌখিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে অর্থ প্রদান না করে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বৈধতা, চাকরির চাহিদাপত্র, নিয়োগের শর্ত এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে ১০ হাজার কর্মীর বিনা খরচে নিয়োগের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অর্থ দাবি করলে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরুর ঘোষণা দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
নতুন ব্যবস্থায় অধিকসংখ্যক এজেন্সির অংশগ্রহণ, বিনা খরচে কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিদেশগমনেচ্ছু কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে নিয়োগের বাস্তব অগ্রগতি, কর্মীদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ম প্রতিরোধ এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকির ওপর।

