ইসলামে জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা; বেশি বেশি দরুদ পাঠ, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও নেক আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ
ধর্ম ও জীবন ডেস্ক । দৈনিক প্রান্তকাল
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
আজ শুক্রবার, মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ পবিত্র জুমার দিন। ইসলামে সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় শুক্রবারের গুরুত্ব ও ফজিলত বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ দিন মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মশুদ্ধি, গুনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে সুন্দর করার সুযোগ পান।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ রয়েছে। মুসলমানদের জন্য এ দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার নামাজ। পাশাপাশি বেশি বেশি দরুদ পাঠ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও অন্যান্য নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে জুমার নামাজের নির্দেশ
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা আল-জুমুআর ৯ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন—
‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং কেনাবেচা বন্ধ করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’
(সুরা আল-জুমুআ, আয়াত: ৯)
এই আয়াতে জুমার নামাজের গুরুত্ব এবং পার্থিব ব্যস্ততার চেয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন শুক্রবার
হাদিসে শুক্রবারকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো শুক্রবার। এ দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এ দিনই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। কিয়ামতও শুক্রবারেই সংঘটিত হবে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)
এই হাদিস থেকে জুমার দিনের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
জুমার দিনে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত
জুমার দিনের অন্যতম ফজিলত হলো দোয়া কবুলের একটি বিশেষ সময়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, শুক্রবারে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫২)
এই বিশেষ সময় কখন, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। অনেক আলেম আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাই জুমার দিনে নিজের, পরিবার, সমাজ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে বেশি বেশি দোয়া করা উত্তম।
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল
ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী জুমার দিনের উল্লেখযোগ্য আমলগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: জুমার নামাজের আগে গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা এবং পবিত্রতার প্রতি যত্নবান হওয়া।
২. আগেভাগে মসজিদে যাওয়া: জুমার নামাজে যথাসম্ভব আগে উপস্থিত হওয়া এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা।
৩. বেশি বেশি দরুদ পাঠ: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা।
৪. সুরা আল-কাহফ তিলাওয়াত: শুক্রবারে সুরা আল-কাহফ পাঠের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে।
৫. দোয়া ও ইস্তিগফার: নিজের ভুলত্রুটির জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং কল্যাণ কামনা করা।
৬. মানবিক ও কল্যাণকর কাজ: অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।
শুধু ইবাদত নয়, মানবিকতার শিক্ষাও
ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, সততা ও মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধিরও একটি সুযোগ। নিজের আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার শিক্ষা দেয় ইসলামের আদর্শ।
পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা একজন মুসলমানের নৈতিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
দেশ ও জাতির কল্যাণে দোয়া
পবিত্র জুমার দিনে মহান আল্লাহর কাছে দেশ, জাতি ও সমগ্র মানবজাতির শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা, মানুষের নিরাপত্তা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার দূর হওয়ার জন্য দোয়া করা প্রত্যেকের সুন্দর ও মানবিক প্রত্যাশা।
একই সঙ্গে অসুস্থ মানুষের সুস্থতা, বিপদগ্রস্ত মানুষের মুক্তি, দরিদ্র মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা এবং বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত ও অসহায় মানুষের নিরাপত্তার জন্য দোয়া করারও আহ্বান জানানো হয় ইসলামি শিক্ষায়।
জুমার শিক্ষা প্রতিফলিত হোক প্রতিদিনের জীবনে
জুমার দিনের তাৎপর্য কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ দিনের শিক্ষা হলো আল্লাহভীতি, আত্মসংযম, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ।
পবিত্র জুমার ইবাদত ও শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জুমার দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করে যথাযথভাবে ইবাদত করার এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের সুন্দর শিক্ষা অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

