শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ব্যবসায় অবদানের স্বীকৃতি; উদ্যোক্তাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান

শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন।

শুক্রবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, গবেষকসহ প্রায় ৪০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। ড. ইউনূসের নাম ঘোষণার পর উপস্থিত অতিথিরা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানান।

চার বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা

এ বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে সম্মানিত করা হয়েছে। অন্যরা হলেন ভারতের সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের (সেবা) পরিচালক রিমা নানাবতী, মার্কিন ফ্যাশন ডিজাইনার ও টোরি বার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ এবং জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান।

তাঁদের মধ্যে মুনা সুখতিয়ানকে বিশেষ ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।

গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রশংসায় হিলারি ক্লিনটন

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে হিলারি ক্লিনটন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ড. ইউনূসের ভূমিকার প্রশংসা করেন।

তিনি জানান, গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।

হিলারি ক্লিনটনের মতে, ড. ইউনূসের উদ্যোগ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রেখেছে।

‘৫০ বছরের কাজের স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য বড় বার্তা’

সম্মাননা গ্রহণের পর বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং গ্রামীণ ব্যাংক ও এর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ আয়োজন বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক শুরু থেকেই নারীদের সক্ষমতা বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা অনেক নারী এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের প্রয়োজন ও অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারছেন। তাঁরা শুধু ঋণগ্রহীতা নন, গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত।

‘চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা হতে হবে’

বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন ড. ইউনূস।

তিনি বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের প্রধানত চাকরির জন্য প্রস্তুত করে। অথচ শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বিকশিত করা।

তরুণদের চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নিজের উদ্যোগে কর্মসংস্থান তৈরির মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

ড. ইউনূসের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন ব্যবসা ও সামাজিক উদ্যোগ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হন।

সামাজিক ব্যবসায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ

নিজের সামাজিক ব্যবসার ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. ইউনূস বলেন, এ ধরনের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন নয়; বরং সমাজের বিদ্যমান সমস্যার কার্যকর সমাধান করা।

তিনি জানান, সামাজিক ব্যবসার অর্থায়নে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যক্তিগতভাবে বণ্টন না করে পুনরায় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালুর আশা

অনুষ্ঠানে নতুন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন ড. ইউনূস।

তিনি জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালুর আশা করছেন তাঁরা। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য হবে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা।

ড. ইউনূসের ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ ধারণা—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ—বাস্তবায়নেও প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও অর্থায়নের সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে এ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার সূচনা করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন